Header Ads

সিঙ্গাপুর কীভাবে বস্তি থেকে উন্নত দেশ হল?

সিঙ্গাপুর কীভাবে বস্তি থেকে উন্নত দেশ হল, ঢাকা ভয়েস, Dhaka Voice, Trending News, Viral News, Top News, bangla news, bangladeshi news, today update ne

আজ থেকে মাত্র ৬০ বছর আগে সিঙ্গাপুর ছিল একটি পরিত্যক্ত বস্তি। তখন দেশটি ছিল মালয়েশিয়ার অধীনে থাকা ছোট এক অনুন্নত দ্বীপ। সে সময় মালয়েশিয়া ছিল মালয় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র। আর সিঙ্গাপুর ছিল চীনা বংশভূতদের দখলে। মালয়েশিয়ার নেতারা আশঙ্কা করতেন এই চীনা প্রধান সিঙ্গাপুর হয়তো একদিন তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে। তাই ইতিনৈতিক টানা পড়েন জাতিগত সংঘর্ষ আর অবিশ্বাসের কারণে ১৯৬৫ সালে মালয়েশিয়া সিঙ্গাপুরকে পরিত্যাগ করে সেই সিদ্ধান্তে সিঙ্গাপুর ভীষণ বিপদে পড়ে যায় কারণ তখনও সিঙ্গাপুরের অর্ধেক খাবার পানি আসতো মালয়েশিয়া থেকে তাদের খাদ্যের ৯০ শতাংশ খাদ্য আমদানি করা হতো সিঙ্গাপুরের নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ বলতেও কিছুই ছিল না সেই সাথে সিঙ্গাপুরের ৭৫% মানুষ বস্তিতে বসবাস করতো দেশটির জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মানুষ ছিল অশিক্ষিত সব মিলিয়ে মালয়েশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সাথে সাথেই সিঙ্গাপুর একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়। সেই শোচনীয় অবস্থা থেকে মাত্র একজন নেতার দূরদৃষ্টির কারণে অশিক্ষিত বস্তিবাসীর একটি দ্বীপ বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত দেশগুলোর একটিতে পরিণত হয়। সিঙ্গাপুরের সেই মহান নেতার নাম লিকওয়ান ইউ। তার নেতৃত্ব সিঙ্গাপুর কীভাবে আমুল বদলে গেল সেই গল্পই জানবো কি আজকে। মালয়েশিয়া থেকে বহিষ্কারের পর লিক ওয়ান ইউ প্রায় দেড় মাস অত্যন্ত হতাশায় কাটিয়ে দেন। কিন্তু তিনি আশা ছাড়েননি। যেহেতু সিঙ্গাপুরের কোন প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল না, তাই তাদের প্রথম কাজ ছিল কূটনীতির মাধ্যমে বিশ্বের স্বীকৃতি আদায় করা। এক মাসের মধ্যেই সিঙ্গাপুর জাতিসংঘের স্বীকৃতি অর্জন করে নেয়। সেই সাথে বৃহত্তর প্রতিবেশীদের সাথেও সম্পর্ক স্থিতিশীল করার প্রচেষ্টা শুরু করে। ইন্দোনেশিয়ার সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে তিনি ব্যক্তিগতভাবে জাকার্তা গিয়েছিলেন। সিঙ্গাপুর ১৯৬৭ সালের মধ্যে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড এবং ফিলিপাইনকে নিয়ে আসি সহপ্রতিষ্ঠাতা হয়। যার ফলে দেশটি আর একা রইল না। তখনও পর্যন্ত সিঙ্গাপুরে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী মোতায়েন ছিল। কিন্তু এক পর্যায়ে ব্রিটিশরাও দ্বীপটি ছেড়ে চলে যায়। ১৯৬৭ সালে লিকওয়ান দেশের নাগরিকদের জন্য বাধ্যতামূলক ন্যাশনাল সার্ভিস চালু করেন। সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য তিনি গোপনে ইসরায়েলের দিকে নজর দেন। তিনি ভাবতেন ইসরায়েল একটা ছোট দেশ হয়েও বৃহৎ প্রতিবেশিদের কীভাবে পরাজিত করে। সেই ধারণা থেকে লিক ওয়ান সামরিক দিক থেকেও স্বনির্ভর হওয়ার নীতি গ্রহণ করেন। আমরা অনেকেই হয়তো জানিনা সিঙ্গাপুর বিশ্বের অন্যতম ক্ষুদ্র দেশ হলেও দেশটির সামরিক বাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত। নিজের দেশের বৈশ্বিক স্বীকৃতি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পর লিকওয়ান দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মনোনিবেশ করেন। সিঙ্গাপুরের অর্থনীতি তখনো ছিল একেবারে বিধ্বস্ত। অর্থ নৈতিক পুনরুদ্ধারের বিষয়ে পরামর্শ নেওয়ার জন্য লিগওয়ান ডাচ অর্থনীতিবিদ এলবার্ট উইনসেমিয়াসকে নিয়ে আসেন। উইনসেমিইয়াসের পরামর্শ ছিল সিঙ্গাপুরকে সফল করতে হলে দ্বীপটিকে বিদেশী কোম্পানিগুলোর কাছে লোভনীয় করে তুলতে হবে। এর জন্য ট্যাক্স মৌকুফ করা, দুর্নীতি দমন করা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং পুরো দ্বীপকে আবর্জনা ও দাঙ্গা মুক্ত করে পরিষ্কার করা প্রয়োজন। লি এই পরামর্শ খুব গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেন। তারপর থেকেই সিঙ্গাপুরে বিদেশী বিনিয়োগ আসতে শুরু করে এবং বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহের ফলে সিঙ্গাপুরে বহু কল কারখানা তৈরি হতে থাকে। বিশেষ করে টেক্সাস ইন্সট্রুমেন্ট, এইচপি বা হিউলেট প্যাকার্ড এবং জেনারেল ইলেকট্রনিক্স এর মতো বেশ কিছু আমেরিকান এবং জাপানি বৃহৎ কোম্পানি সিঙ্গাপুরে তাদের কার্যক্রম শুরু করে। সেই সাথে ব্রিটিশদের পরিত্যক্ত ডকয়ার্ডগুলোকে সংস্কার করে শিপইয়ার্ডে রূপান্তর করা হয়। লিকন তখন দেশের সম্পদ বিনিয়োগ করে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স এবং নেপচুন ওরিয়েন্ট লাইন্স নামের সিঙ্গাপুরের জাতীয় শিপিং কোম্পানি তৈরি করেন। এই দুই জাতীয় কোম্পানির উপার্জন থেকেই সিঙ্গাপুরের নাগরিকদের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটে। ১৯৮১ সালে সিঙ্গাপুরের চাঙ্গী বিমানবন্দর তৈরি করা হয়। যা অতি অল্প সময়ে বিশ্বের সেরা বিমানবন্দর হয়ে ওঠে। প্রশাসনের দক্ষতা বজায় রাখা এবং দুর্নীতি বন্ধ করার জন্য লি তার মন্ত্রিসভা এবং সরকারি কর্মচারীদের বেতন দ্বিগুণ করে দেন। তখন থেকে সিঙ্গাপুরের দুর্নীতি দমন তদন্ত ব্যুরো সিপিআইবি নিয়মিত তদারুকী করত এবং দুর্নীতিগ্রস্ত সবাইকে ধরে ধরে জেলে ঢুকিয়ে দিত। লির নীতি ছিল কেউ আইনের ঊর্ধে নয়। যদি একজনের জন্য আইন শিথিল করা হয় তাহলে সবাই সেই সুযোগ নিতে চাইবে। সে কারণে লিগওয়ানের জাতীয় উন্নয়ন মন্ত্রীও ঘুষ নেওয়ার দায়ে ধরা পড়ার পর আত্মহত্যা করেছিলেন। সিঙ্গাপুর ছিল একটি মিশ্র জাতির দেশ। এখানে মূলত চীনা, মালয় এবং ভারতীয়রা বসবাস করতো। নানা ইস্যুতে তিন জাতির লোকেরা প্রায়ই সহিংসতায় জড়িয়ে পড়তো। লি ঘোষণা করেন যে সকল জাতিই সমান। তিনি চাইনিজ, মালয়, তামিল এবং ইংরেজির মত চারটি সরকারি ভাষা প্রবর্তন করেন। তবে তাদের জাতি হিসেবে ঐক্যবদ্ধ করতে লিক ওয়ান, সিঙ্গাপুরে ইংরেজি ভাষা বাধ্যতামূলক করেন। সামাজিক বিভেদ দূর করার জন্য যেকোনো ধরনের ধর্মীয় প্রচার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। লি সামাজিক প্রকৌশলের মাধ্যমে এমনভাবে আবাসনকোটা তৈরি করেন যাতে চীনা, মালয় এবং ভারতীয়রা পাশাপাশি থাকতে বাধ্য হয়। সেই সাথে শিক্ষা ব্যবস্থাও পুনর্গঠন করা হয়। যাতে সিঙ্গাপুরের স্থানীয় প্রকৌশলী প্রযুক্তিবিদ এবং কর্মীরা বিদেশী কোম্পানিগুলোতে সফলতার সাথে কাজ করতে পারে। সিঙ্গাপুরের এত এত উন্নতি হলেও তখনো দেশটির চার ভাগের তিন ভাগ লোকই বস্তি এবং কুড়েঘর বাস করত। তাই লিকওয়ান হাউজিং ডেভেলপমেন্ট বোর্ডকে শক্তিশালী করেন। এর মাধ্যমে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষকে উন্নত এপার্টমেন্টে স্থানান্তরিত করা হয় । সেই সাথে দেশের সকল নাগরিকের অবসর ভাতার জন্য প্রত্যেকের আয়ের ২০ শতাংশ সরকারি ফান্ডে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। এর ফলে একসময় জাতীয় পুজির এক বিশাল ভান্ডার তৈরি হলেও লিকওয়ান কখনো নাগরিকদের ভরতুকি বা ভাতা দেননি । কারণ তিনি মনে করতেন প্রত্যেক নাগরিককে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে । পরবর্তীতে সমগ্র দেশকে আরো উন্নত করতে লিকওয়ান গার্ডেন সিটি প্রকল্প শুরু করেন। এর মাধ্যমে মহাসড়কের পাশে গাছ লাগানো, নদীগুলো আবর্জনামুক্ত করা এবং শহরে বহু পার্ক তৈরি করা হয়। সেই সাথে ব্যাপক পরিচ্ছন্নতা এবং সবুজায়নের মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বকে জানান দেওয়া হয় যে সিঙ্গাপুর আর বস্তি নেই। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে লিকওয়ান ছোট বড় নানা ধরনের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। যেমন সিঙ্গাপুরে একসময় চুইঙ্গাম নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। মাদক পাচারকারীদের সরাসরি ফাঁসি দেওয়া হতো। আবর্জনা ফেলা, থুতু ফেলা কিংবা যত্রতত্র রাস্তা পারাপারের জন্য হাজার হাজার ডলার জরিমানা করা হতো। এরকম কঠোর শৃঙ্খলা এবং অবিচল মনোভাবের কারণেই সিঙ্গাপুর বিশ্বের অন্যতম ধনী এবং উন্নত দেশে পরিণত হয়েছিল। লিকওয়ান তার দৈর্ঘ্য ২৫ বছরের সৈর শাসনের সময় নাগরিকদের ব্যক্তিজীবনে হস্তক্ষেপের জন্য সমালোচিত ছিলেন। তবে তিনি এর পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, তিনি যদি এতটা কঠোর না হতেন তাহলে সিঙ্গাপুর আজ এখানে আসতে পারতো না। তার দর্শন ছিল নেতারাই ঠিক করে কোনটি সঠিক। জনগণ কী ভাবছে তাতে কিছু আসে যায় না। শুধু দেশের জনগণের সাথেই নয় বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রেও লিকওয়ান কঠোর ছিলেন। সিঙ্গাপুরে আমেরিকার গুপ্তচর বৃত্তির নীল নকশা ধরা পড়ার পর লিকওয়ান আমেরিকার উপর ১০০ মিলিয়ন ডলার জরিমানা ধার্য করার সাহস করেছিলেন এবং অবাক করা বিষয় হলো আমেরিকা সেই অর্থে পরিশোধও করেছিল। ২০০০ সালের মধ্যে সিঙ্গাপুরের মাথাপিছু জিডিপি কানাডা এবং ফ্রান্সের সমান হয়ে যায়। ২০২৩ সালে মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে সিঙ্গাপুর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেও ছাড়িয়ে যায়। লিক ওয়ানের মডেল এতটাই সফল ছিল যে ১৯৭৮ সালে দে-জিওপিং যখন চীনের সংস্কার শুরু করেন তখন তিনি সিঙ্গাপুরকে মডেল হিসেবে গ্রহণ করেন। অবশেষে ২০১৫ সালে ৯১ বছর বয়সে সিঙ্গাপুরের নন্দিত এক নায়ক লিক ওয়ান ইউ মারা যান। লিকওয়ানের মত কল্যানকামী সৈর শাসকের কারণেই সিঙ্গাপুর পৃথিবীর অন্যতম উন্নত দেশে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে সিঙ্গাপুর ইলেকট্রনিক্স , শিপিং, ফিন্যান্স এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে এশিয়ান এবং পশ্চিমা বাণিজ্যের একটি সংযোগস্থল হিসেবে কাজ করছে।

No comments

Powered by Blogger.