Header Ads

মিসরের ফারাওদের কয়েক হাজার বছর আগেই মমি বানাত এশীয়রা

  

মিসরের ফারাওদের কয়েক হাজার বছর আগেই মমি বানাত এশীয়রা, ঢাকা ভয়েস, Dhaka Voice, Trending News, Viral News, Top News

বিশ্বের প্রাচীনতম মানব মমি চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রায় ১০ হাজার বছর আগে ধোঁয়ায় শুকিয়ে সংরক্ষণ করা হয়েছিল বলে জানালেন গবেষকেরা। মমিফিকেশন পদ্ধতি চালু হওয়ার বহু আগেই, যখন মিসর ও চিলেতে মমি তৈরির রেওয়াজ ছিল না, তখন এই অঞ্চলে মৃতদেহ সংরক্ষণের এই অভিনব রীতির প্রচলন ছিল।

গত সোমবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ‘পিএনএএস’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, চীন, ফিলিপাইন, লাওস, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় পাওয়া শতাধিক প্রাচীন কবর বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অনেক কঙ্কালকে ভাঁজ করা বাঁকানো অবস্থায় (হাইপারফ্লেক্সড) কবর দেওয়া হয়েছিল। গবেষকেরা বলছেন, এসব দেহ মৃত্যুর পর আগুনের ওপর দীর্ঘ সময় ধোঁয়ায় শুকিয়ে কবর দেওয়া হয়েছিল।

গবেষণার প্রধান লেখক ও অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো হ্সিয়াও-চুন হাং ‘লাইভ সায়েন্স’কে দেওয়া এক ই-মেইল সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘এই ধোঁয়ায় শুকানো শুধু পচন রোধ করতেই নয়, বরং এর পেছনে আধ্যাত্মিক, ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক কোনো তাৎপর্য ছিল।’

গবেষকেরা জানান, ৪ হাজার থেকে ১২ হাজার বছর আগের অনেক কবরেই দেহগুলো অস্বাভাবিকভাবে ভাঁজ করে কবর দেওয়া হয়েছিল, যা প্রাকৃতিকভাবে সম্ভব নয়। ২০২২ সালে পর্তুগালে পাওয়া একটি একই ধরনের কঙ্কালকেও মমি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, কারণ এটি সম্ভবত পচন চলাকালীন দেহকে বাঁধা অবস্থায় রাখা হয়েছিল, ফলে অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে স্বাভাবিক সীমার বাইরে ভাঁজ করা সম্ভব হয়েছিল।

তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক কবরেই কঙ্কালের ওপরে আগুনে পোড়া দাগ থাকলেও কবরস্থানে আগুন লাগার কোনো চিহ্ন নেই, যা ইঙ্গিত করে—কবর দেওয়ার আগে মৃতদেহের ওপরে কোনো ধর্মীয় আচারে আগুন ও ধোঁয়ার ব্যবহার ছিল।

গবেষণায় এক্স-রে ডিফ্রাকশন ও ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কোপির মতো অ-ধ্বংসাত্মক প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেখা গেছে, এসব হাড়ে কম তাপমাত্রায় আগুনে পোড়ার চিহ্ন এবং কালি জমার প্রমাণ আছে, যা সোজাসুজি দাহ নয় বরং ধোঁয়ায় শুকানোর প্রমাণ দেয়।

গবেষকেরা আরও বলেন, দক্ষিণ চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রাক-কৃষি সম্প্রদায়গুলোয় ধোঁয়ায় মৃতদেহ শুকিয়ে সংরক্ষণের এই বিশেষ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া পদ্ধতি ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। ২০১৯ সালে গবেষকেরা ইন্দোনেশিয়ার পাপুয়া প্রদেশে গিয়ে দানি ও পুমো জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে এমন রীতির উপস্থিতি প্রত্যক্ষ করেছেন, যেখানে মৃতদেহকে শক্ত করে বাঁধা হয়, আগুনের ওপরে রাখা হয় এবং দীর্ঘ সময় ধোঁয়ায় শুকানো হয় যতক্ষণ না দেহ পুরোপুরি কালো হয়ে যায়।

যদিও এসব প্রাচীন কঙ্কালে চামড়া, নরম টিস্যু বা চুল অবশিষ্ট নেই, তথাপি গবেষকেরা বলেন, এগুলোকে মমি বলার যৌক্তিকতা আছে, কারণ এগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে ধোঁয়ায় শুকিয়ে সংরক্ষণ করা হয়েছিল।

হ্সিয়াও-চুন হাং বলেন, ‘প্রথাগত মমির সঙ্গে পার্থক্য হলো, এই প্রাচীন মমিগুলো ধোঁয়ায় শুকানোর পর কোনো পাত্রে সিল বা আবদ্ধ করে রাখা হতো না। ফলে এগুলোর সংরক্ষণশীলতা সাধারণত কয়েক দশক থেকে কয়েক শতক পর্যন্ত স্থায়ী হতো।

তিনি আরও বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গরম ও আর্দ্র জলবায়ুতে মৃতদেহ সংরক্ষণের জন্য ধোঁয়ায় শুকানোই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি ছিল।

তবে এই প্রাচীন জনগোষ্ঠী কীভাবে বুঝতে পারল যে, ধোঁয়ায় মৃতদেহ সংরক্ষণ করা যায়—তা এখনো এক রহস্য। হাং বলেন, ‘সম্ভবত কোনো ধর্মীয় আচার থেকেই ধোঁয়ায় শুকানোর ধারণা এসেছে, অথবা প্রাণীর মাংস ধোঁয়ায় সংরক্ষণ করতে গিয়ে মানুষ তা মানবদেহের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটি নিশ্চিত যে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মৃত স্বজনের দেহ আরও কিছুদিন জীবিতদের কাছে দৃশ্যমান রাখা যেত—একটি আবেগঘন ও মানবিক অভিব্যক্তি, যা ভালোবাসা, স্মৃতি ও শ্রদ্ধাবোধকে প্রকাশ করে।’


দুটি স্তরের মানব অভিবাসনের মডেল

গবেষণায় প্রাপ্ত মমিগুলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মানব অভিবাসনের ‘দুই স্তরের মডেল’-এর পক্ষেও প্রমাণ দেয়। এই মডেল অনুসারে, প্রায় ৬৫ হাজার বছর আগে প্রাচীন শিকারি সম্প্রদায়ের মানুষ এই অঞ্চলে আসে এবং তাদের থেকে ভিন্ন একদল নব্যপ্রস্তর যুগের কৃষিজীবী মানুষ আসে প্রায় ৪ হাজার বছর আগে। প্রাচীন ধোঁয়ায় শুকানো দেহ সংরক্ষণের রীতিটি সম্ভবত প্রথম দলে আসা শিকারি সম্পদ্রায়ের মধ্যেই প্রচলিত ছিল, যারা আজকের দানি ও পুমো জাতিগোষ্ঠীর পূর্বসূরি হতে পারে।

নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞান-নৃবিজ্ঞানী আইভি হুই-ইউয়ান ইয়েহ বলেন, এই গবেষণা দুই স্তরের মডেলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং প্রাচীন মানব অভিবাসন, বিস্তার ও যোগাযোগের ছবিকে আরও পরিষ্কার করে।

গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, যদি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পাওয়া হাইপারফ্লেক্সড সমাধিগুলোকে ধোঁয়ায় শুকানো মমি হিসেবে ধরা হয়, তবে ধরে নেওয়া যায়—এই রীতি আরও পুরোনো ও বিস্তৃত ছিল, যতটা আগে ধারণা করা হয়েছিল।

গবেষকেরা বলেন, মানুষের মৃতদেহ ধোঁয়ায় শুকিয়ে সংরক্ষণের এই রীতির সূচনা হতে পারে হোমো স্যাপিয়েন্স যখন আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ছিল তখন, অর্থাৎ প্রায় ৪২ হাজার বছর আগেও। এটি মানব জাতির গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী জৈব ও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার প্রমাণ দেয়।

No comments

Powered by Blogger.