Header Ads

পোপের কাজ কী ?

পোপের কাজ কী ?

পোপ হলেন রোমান ক্যাথলিক চার্চের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা। পোপকে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পাদ্রী বা হোলি ফাদার বলেও সম্বোধন করা হয়। পোপ শুধুমাত্র একজন ধর্মীয় নেতা নন। তিনি একজন সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক এবং কূট নৈতিক ব্যক্তিত্ব। যিনি ভ্যাটিকান সিটির শাসক হিসেবে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানের ভূমিকাও পালন করেন। মধ্যযুগীয় ইউরোপে পোপ ছিল ক্ষমতার সর্বোচ্চ কেন্দ্র। তৎকালীন সময়ের ছোটখাটো রাজা থেকে শুরু করে সম্রাট পর্যন্ত সবাই পোপের ভয়ে কাপতো এমনকি অতীতে টাকার বিনিময়ে পোপেরা স্বর্গে যাওয়ার টিকিটও বিক্রি করতে অতীতে পোপের ক্ষমতার ব্যাপক অপব্যবহারের কারণে খ্রিস্টান অর্থোডক্স ধারার জন্ম হয় এবং পোপের ভয়াবহ দুর্নীতির কারণেই মূলত প্রটেস্ট্যান্ট নামে খ্রিস্টান ধর্মের আলাদা শাখা তৈরি হয় তাই পোপ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা সকল খ্রিস্টানদের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু নন অর্থোডক্স ও প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টানরা পোপের কর্তৃত্ব অস্বীকার করে। ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা পোপ ঐতিহাসিকভাবে আসলে কি কি কাজ করে আসছে সে সম্পর্কে আলোচনা করা হবে। প্রায় ২০ হাজার বছর আগে খ্রিস্টান ধর্মের একেবারে গোড়ার দিকে যীশুখ্রীস্ট যখন তার শিষ্যদের মধ্যে একজনকে বিশেষ দায়িত্ব দিয়েছিলেন তখন থেকেই পোপের ইতিহাস শুরু হয়। খ্রিস্টানদের বিশ্বাস অনুযায়ী যীশুর সেই বিশেষ শিষ্য ছিলেন সেন্ট পিটার। বলা হয় যীশু বলা হয় যীশু তাকে বলেছিলেন, তুমি পাথরের মত শক্ত। আমি এই পাথরের উপর আমার চর্চা গড়ে তুলবো। এই পিটারকেই পরবর্তীতে প্রথম পোপ হিসেবে গণ্য করা হয়। খ্রিস্ট ধর্ম প্রথমদিকে একটি অত্যন্ত নির্যাতিত ধর্ম ছিল। রোম সাম্রাজ্যের অধীনে খ্রিস্টানরা প্রায়ই অত্যাচারের শিকার হতো। কিন্তু সেই সময়ই সেন্ট পিটার রোম শহরে আসেন এবং খ্রিস্টানদের সংগঠিত করে ধর্মপ্রচার শুরু করেন। ৬৪ খ্রিস্টাব্দে রোমান সম্রাট নিরোর নির্দেশে সেন্ট পিটারকে ক্রশ বৃদ্ধ করে হত্যা করা হয় এবং তার কবরের উপরই গড়ে ওঠে সেন্ট পিটার্স ব্যাসেলিকা যা আজকের ভ্যাটিকান সিটির মূল কেন্দ্র। পিটারকে যেহেতু যীশুর সরাসরি নিযুক্ত প্রতিনিধি হিসেবে দেখা হয়, তাই রোম শহরে যারা পরবর্তী সময়ে চার্চের নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদেরকেও পোপ হিসেবে গণ্য করা হয়। পোপ শব্দটি এসেছে গ্রিক ভাষার প্যাপাস থেকে। যার অর্থ হল পিতা। এটি একটি সন্মানসূচক ডাকনাম। যা প্রাচীনকালে সম্মানিত ধর্মীয় ব্যক্তিদের জন্য ব্যবহিত হতো। প্রথমদিকে পোপের ক্ষমতা শুধুই রোম শহর ও তার আশেপাশের এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পোপের ক্ষমতা ও প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে গোটা ইউরোপ এবং পরবর্তীতে সারা বিশ্বে । মধ্যযুগে এসে পোপ শুধু ধর্মীয় নেতা নন বরং ইউরোপের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন। রাজা সম্রাটদের অভিষেক, যুদ্ধবিরতি এমনকি ক্ররুসেডের মতো ধর্মযুদ্ধের নেতৃত্ব পর্যন্ত দিতেন পোপেরা। তৎকালীন সময়ে পোপকে প্রায় ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে মনে করা হতো। মধ্যযুগে ইউরোপ মানেই চার্চ নিয়ন্ত্রিত সমাজ ব্যবস্থা। আর চার্চের শীর্ষে ছিলেন পোপ। খ্রিস্টানদের বিশ্বাস ছিল পোপ হলেন ঈশ্বরের প্রতিনিধি এবং যীশু খ্রিস্টের উত্তরসুরি সেন্ট পিটারের চেয়ারে বসা ব্যক্তি তাই পোপের সিদ্ধান্ত স্বর্গীয় অনুমোদন হিসেবে বিবেচিত হতো অনেক সময় দেখা যেত রাজা হতে হলে পোপের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হতো এমনকি কাউকে কাউকে পোপ নিজ হাতে রাজমুকুট পড়িয়ে দিতেন মধ্যযুগে পোপ চাইলেই যে কাউকে গির্জা থেকে বহিষ্কার করতে পারতেন তার মানে হল ওই ব্যক্তি কখনো স্বর্গে যেতে পারবে না এই কারণে তৎকালীন ইউরোপ রাজা এবং সম্রাটরাও পোপের ভয়ে কেপে উঠতো। ১১ শতকে জার্মান সম্রাট হেনরি পোপ সপ্তম গ্রেগরির বিরাট ভাজন হন এবং ক্ষমা চাইতে পোপের প্রাসাদের সামনে তিনদিন বরফে দাঁড়িয়ে থাকেন। একে বলা হয় ওয়াকটু ক্যানোসা। যা মধ্যযুগে পোপের ক্ষমতায় প্রতীক হয়ে ওঠে। ১০৯৫ সালে পোপ দ্বিতীয় আরবান ফাস্ট ক্রুসেট বা প্রথম ধর্মযুদ্ধের ঘোষণা দেন। তার আহ্বানে হাজার হাজার ইউরোপীয় খ্রিস্টান যোদ্ধারা জেরুজালেম পুনরুদ্ধারে বেরিয়ে পড়ে। এই ক্রুসেট যুদ্ধগুলো শুধু ধর্মীয় নয় বরং রাজনীতি ও ভূখন্ড দখলের খেলা ছিল । তখনকার সময়ে কোন কোন পোপ ক্ষমতালোভীর সম্রাটদের মতোই আচরণ করতেন। শুধু তাই নয় , তৎকালিক সময়ে চার্চ ইউরোপের সবচেয়ে বেশি জমির মালিক ছিল। মানুষ স্বর্গে যাওয়ার আশায় তাদের জমি এবং সোনাদানা চার্চে দান করতো। এর বাইরে পোপ ট্যাক্সও নিতেন। যাকে বলা হতো টিথি অর্থাৎ মানুষের আয় বা ফসলের ১০ শতাংশ চার্চে দান করতে হতো। অতীতে চার্চেই ছিল শিক্ষা ও জ্ঞান চর্চার মূল কেন্দ্র। চার্চের ছায়াতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম হয়েছে। সে সময় ধর্মযাজকরা বই লেখা ও সংরক্ষণের কাজ করতেন। সে কারণেই মধ্যযুগীয় ইউরোপে ধর্ম ছিল জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দু। প্রাচীন সময়ে খ্রিস্টান চার্চ একটাই ছিল। কিন্তু সালে ঘটে এক বিশাল ধর্মীয় বিভাজন। যাকে বলে দ্য গ্রেট স্কিজম। এই বিভাজনের ফলে খ্রিস্ট ধর্ম দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। যার একদিকে ছিল রোমান ক্যাথলিক এবং অন্যদিকে ইস্টার্ন অর্থোডক্স। পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো ছিল রোমান ক্যাথলিক। তারা পোপের কর্তৃত্ব মেনে চলত। কিন্তু গ্রিস ও রাশিয়ার মতো পূর্ব ইউরোপের অঞ্চলগুলো এবং ইথিওপিয়ার মতো প্রভাবশালী খ্রিস্টান অঞ্চলগুলো মনে করতে শুরু করে পোপ রোম শহরের একজন বিষয়মাত্র এবং তার কোন সর্বোচ্চ ক্ষমতা নেই। অর্থোডক্সদের মতে প্রত্যেক দেশের নিজস্ব ধর্মীয় নেতা থাকবে। যাকে প্যাটিয়ার্ক বলা হয়। তাদের মতে পোপ অন্য ধর্মীয় নেতাদের উপরে নয় বরং সবাই সমান। তবে পোপের ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার পেছনে অন্যতম আরেকটি কারণ ছিল চার্চ এবং পোপের ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ব্যাপক দুর্নীতি। টাকা কামানোতে ক্যাথলিক চার্চগুলো এতটাই মত্ত হয়ে উঠেছিল যে তারা অর্থের বিনিময়ে পাপ মুক্তির সার্টিফিকেট দিতে শুরু করে। এগুলোকে বলা হতো ইন্ডালজেন্স। অর্থাৎ কেউ যদি টাকা দিত তবে চার্চ বলতো তোমার আত্মা এখন স্বর্গে যাবে। এগুলো অনেকটা স্বর্গের টিকিটের মতো বিক্রি হতো। এই ধরণের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ ক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে। এই প্রতিবাদে নেতৃত্ব দেন মার্টিন লুথার নামের এক জার্মান ধর্মযাজক। তিনি ১৫১৭ সালে ৯৫ টি অভিযোগ লিখে চার্চের দরজায় টাঙ্গিয়ে দেন। এর থেকেই শুরু হয় প্রোটেস্ট্যান্ট আন্দোলন। যার ফলে ক্যাথলিক বনাম প্রটেস্ট্যান্ট নামে খ্রিস্টান চার্চ আবারো দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। প্রটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টানদের বিশ্বাস হলো ঈশ্বরের সাথে মানুষের সম্পর্কের জন্য পোপ বা গির্জার দরকার নেই। প্রত্যেক ব্যক্তি নিজেই সরাসরি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে পারে। তাই ধর্মের ব্যাপারে পোপ নয় বাইবেলই শেষ করা। ১৫৩৪ সালে ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরি দ্বিতীয় করার পর পোপ তার দ্বিতীয় বিয়ে মেনে নেয়নি। তখন রাজা হেনরি রোমের পোপকে অস্বীকার করে নিজেই চার্চ অফ ইংল্যান্ড প্রতিষ্ঠা করেন। এর মাধ্যমেও রোমান ক্যাথলিক চার্চ দুর্বল হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ইউরোপীয় রেনেসা বা নবজাগরণের সময় মানুষ যুক্তিবিজ্ঞান মানবতা নিয়ে ভাবতে শুরু করে। সেই সাথে গুটেনবার্গ প্রিন্টিং প্রেস আবিষ্কৃত হবার পর বাইবেল সহ হাজারো বই সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছাতে শুরু করে। আগে এইসব বই শুধু গির্জার ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষ নিজেরা বাইবেল পড়তে শুরু করার পর বুঝতে পারে তাদের ধর্মে পোপের কোনো বিশেষত্ব নেই। তাই একসময় ধীরে ধীরে ইউরোপ তথা বিশ্বজুড়ে পোপের কতৃত্ব হ্রাস পেতে থাকে। আধুনিক যুগে এসে পোপের ভূমিকা কিছুটা বদলেছে। এখন পোপ সরাসরি রাজনীতি করে না বরং শান্তি, ন্যায়বিচার, অন্তধর্ম সম্প্রীতি এবং পরিবেশ রক্ষার মত বিষয়ে পোপ নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। যেকোনো বড় সংকটে বা যুদ্ধবিরোধী আহ্বানে পোপের কন্ঠস্বর বিশ্বনেতারাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন। একজন পোপ মারা যাবার পর পেপাল কনক্লেভ নামের একটি বিশেষ ধর্মীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। যার মাধ্যমে পরবর্তী পোপ নির্বাচন করা হয় এবং একজন ব্যক্তি পোপ হিসেবে নির্বাচিত হবার পর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পোপের দ্বায়িত্ব পালন করেন। যেহেতু পোপের বাসস্থান ভ্যাটিকান সিটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র তাই এর শাসক হিসেবেও পোপ কাজ করেন। ভ্যাটিকান সিটি বিশ্বের সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবেও পরিচিত। পোপের বাসস্থান ভ্যাটিকান সিটি ।

No comments

Powered by Blogger.