গ্রেটার ইসরায়েল আসলে কী ?
ইসরাইল তার বর্তমান সীমানা ছাড়িয়ে প্রতিবেশী দেশ মিশর
, জর্ডান, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, সৌদি আরবসহ আশেপাশের কয়েকটি দেশ দখল করে বিশাল এক
দেশ গড়ে তুলতে চায়। একেই বলা হয় গ্রেটার ইসরাইল। এতদিন পর্যন্ত এই ধারণাকে শুধু ষড়যন্ত্র
তত্ত্ব বলে উড়িয়ে দেওয়া হলেও ইসরাইলের মানবতা বিরোধী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
তার গ্রেটার ইসরাইল ধারণা বাস্তবায়নের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে উচ্চারণ করেছে। বেনিয়ামিন
নেতানিয়াহুর বিতর্কিত গ্রেটার ইসরাইল স্বপ্ন আরব ও মুসলিম দেশগুলোতে তীব্র প্রতিক্রিয়ার
সৃষ্টি করেছে। যার ফলে ফিলিস্থানের গাজায় দীর্ঘদিন থেকে গণহত্যা আর জাতিগত নিধনে চুপ
থাকা আরব বিশ্বের টনক নড়েছে। নিজেদের ভূখন্ড হারানোর ভয়ে জর্ডান এবং মিশর গ্রেটার
ইসরাইল ধারণার নিন্দা জানিয়েছে। গ্রেটার ইসরাইল ধারণা কিভাবে শুরু হয়েছিল, জায়নবাদীরা
কিভাবে বহু আগে থেকেই গ্রেটার ইসরাইল বাস্তবায়নের কার্যক্রম চালাচ্ছে এবং এ বিষয়ে নেতানিয়াহুর
পরিকল্পনা কি সে সম্পর্কে আলোচনা করা হবে। গ্রেটার ইসরাইল ধারণার মূলত দুটি সংস্করণ
রয়েছে। একটি ছোট পরিসরে আরেকটি বৃহত্তর পরিসরে। বর্তমানে ছোট পরিসরে গ্রেটার ইসরাইল
প্রতিষ্ঠার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। ছোট পরিসরে গ্রেটার ইসরাইল বলতে সাধারণত বর্তমান
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইসরাইল রাষ্ট্রের সীমানার সঙ্গে দখলকৃত গোলান মালভূমি, পশ্চিম
তীর ও গাজা উপত্যকা যোগ করে সমগ্র ভূমিকে গ্রেটার ইসরাইল বলা হয়। অন্যদিকে বৃহত্তর
অর্থে গ্রেটার ইসরাইল মানে হলো নীলনদ থেকে ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত বিস্তৃত বাইবেলে বর্ণিত
প্রতিশ্রুত ভূমির পরিসীমা। এই ব্যাখা অনুসারে মিশরের সিনাই উপদ্বীপ ও নীলনদের পূর্বতীর
সমগ্র ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন, জর্ডান নদীর পূর্বাঞ্চল বা বর্তমান সমগ্র জর্ডান দেশ লেবানন
, সিরিয়ার একটি বড় অংশ এবং ইরাক ও সৌদি আরবের কিছু অংশ এই প্রতিশ্রুত ভূমির মধ্যে পড়েছে
। বাইবেলে আব্রাহাম বা হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের বংশধরদের উদ্দেশ্যে মিশরের নীলনদ
থেকে ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত ভূমি দেওয়ার কথা উল্লেখ আছে। আধুনিক জায়নবাদের জনক থিয়েডর
হারজেল তার ডায়রিতে ইঙ্গিত করেছিলেন যে ভবিষ্যত ইহুদি রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানা রাজা
সলেমন ও দাউদের আমলের প্রাচীন ইসরাইলের মতো বিস্তৃত হবে এই রাজা সোলেমান ও দাউদ ইসলাম
ধর্মে সুলাইমান ও দাউদ আলাইহিস সালাম হিসেবে পরিচিত সেই ধারণা বাস্তবায়িত হলে মিশর
, লেবানন, সিরিয়া , ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব ও পুরো জর্ডানসহ বিশাল আরব ভূখন্ড ইসরাইলের
আওতায় আসবে। ইসরাইলের সাধারণ মানুষের মধ্যে গ্রেটার ইসরাইল ধারণা অতীতে অতটা প্রকট
ছিল না। ফিলিস্তিনি ভূখন্ড দখল করে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রথম কয়েক দশক বামপন্থী
জায়নিস্টরা সীমিত ভূখন্ডে একটি ইহুদি রাষ্ট্রকে বাস্তব সমাধান হিসেবে মেনে নিয়েছিল। তবে ডানপন্থী রিভিশনিস্ট জায়নিস্টরা শুরু থেকেই ব্রিটিশ ম্যান্ডেট ভূক্ত পুরো ফিলিস্তিনকে
ইসরায়েলের ভবিষ্যত ভূখন্ড হিসেবে দাবি করে আসছিল। ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরাইল
যখন ফিলিস্তানের পশ্চিম তীর গাজা, পূর্ব জেরুজালেম, গোলান মাল্ভূমি এবং সিনাই উপদ্বীপ
দখল করে নেয়, তখন গ্রেটার ইসরাইল ধারণা নতুন শক্তি পায়। ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো
একে বাইবেল প্রদত্ত অধিকার হিসেবে ব্যাখ্যা করে দখলকৃত অঞ্চলে বসতি স্থাপন করতে শুরু
করে। বর্তমানে এই ধারণা ইসরাইলের ডানপন্থী ও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী রাজ নৈতিকদের ব্যাপকভাবে
প্রভাবিত করেছে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী সরাসরি জর্ডান
নদীর দুই পাড়েই ইসরাইলের সার্ব ভৌমত্ব দাবি করেছে। ইসরাইলের বর্তমান অর্থমন্ত্রী বেজাল
স্মোট্রিচ ২০২৩ সালের মার্চে প্যারিসে এমন একটী মানচিত্রের সামনে বক্তব্য দেয় যাতে
জর্ডান ও পশ্চিম তীরকে ইসরাইলের অংশ দেখানো হয়। একই বক্তৃতায় সে উদ্ধতভাবে ঘোষণা করে
ফিলিস্তিনি বলে আদৌ কোনো জন গোষ্ঠী নেই এবং সে পুরো ভূমির উপর ইহুদি অধিকার জোরালোভাবে
দাবি করে। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে ইসরাইলের সৈন্যদের ইউনিফর্মেও নাইল টূ ইউফ্রেটিস প্রতীকের
ব্যবহার দেখা গেছে। যা বৃহত্তর ভূখন্ডে গ্রেটার ইসরাইল আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। জানিস্টরা
ইতিহাস জুড়েই নানা ধাপে গ্রেটার ইসরাইল ধারণা বাস্তবায়নের দিকে কার্যক্রম পরিচালনা
করেছে। শুরুর দিকে জায়নিস্ট নেতারা কৌশলগত কারণে প্রথমে আংশিক ভূখন্ডে ইহুদি রাষ্ট্র
মেনে নিলেও পরবর্তীকালে পুরো ভূমিদখলের বাসনা লালন করতো। ইসরাইলের প্রতিষ্ঠাতা এবং
প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেনগুরিয়ন ১৯৩৭ সালে তার পুত্রকে লেখা একটি চিঠিতে বলেছিল
কোন জায়নিস্টি ইসরাইলের ভূমির এক টুকরো অংশও পরিত্যাগ করতে পারে না। আংশিক ভূখন্ডে
একটি ইহুদি রাষ্ট্র আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয় বরং সূচনা মাত্র। একটি ছোট রাষ্ট্র আমাদের
ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। আর ক্ষমতা বাড়লেই আমরা সমগ্র দেশ দখলে আরো সক্ষম হব। ইসরাইলের
প্রথম রাষ্ট্রপতি চেইম ওয়েজম্যানও ব্রিটিশ হাই কমিশনারকে লেখা একটি চিঠিতে বলে সাময়িকভাবে
সীমিত ভূখন্ড মেনে নিলেও ২৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে আমরা পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়বো। জায়নবাদী
নেতাদের এই নীতিগত অবস্থান পরবর্তী সময়ে সত্যে পরিণত হয়। ইসরাইল তার জন্মলগ্ন থেকেই
ভূখন্ড প্রসারের উপায় হিসেবে যুদ্ধকে ব্যবহার করেছে। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার
সময় জাতিসংঘ স্বীকৃত সীমানার চাইতেও তারা ২২ শতাংশ বেশি এলাকা দখল করে নিয়েছিল । পরবর্তীতে
১৯৬৭ সালের যুদ্ধ ইসরাইলকে একলাফে পশ্চিম তীর, গাজা, পূর্ব জেরুজালেম, সিরিয়ার গোলান
মালভূমি এবং মিশরের সিনাই উপদ্বীপ দখলের সুযোগ করে দেয়। এই বিজয়কে গ্রেটার ইসরাইল বাস্তবায়নের
ঈশ্বরীয় সংকেত বলে মনে করে তারা। যদিও আন্তর্জাতিক চাপে ১৯৭৯ সালে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির
মাধ্যমে ইসরাইল মিশরকে সিনাই উপদ্বীপ ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়। তবে ১৯৬৭ সালের পরপরই
গোলান মাল্ভূমি পশ্চিম তীর ও গাজায় অসংখ্যা ইসরাইলি বসতি স্থাপন শুরু হয়। সেই থেকে
ইসরাইল নিত্যনতুন অবৈধ বসতি গড়েই যাচ্ছে। সম্প্রতি ফিলিস্তিনি এলাকায় বহু নতুন আবাসন
ইউনিট অনুমোদনের ঘোষণা দিয়ে অর্থমন্ত্রী স্মোট রিচ বলেছিল এতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের
সম্ভাবনার কবর রচিত হবে অবৈধ ভাবে ফিলিস্তিনি অঞ্চলে বসতি স্থাপন করা গ্রেটার ইসরাইল
ধারণা বাস্তবায়নের পূর্ণতম হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয় বর্তমানে যুদ্ধকালীন সুযোগকে
কাজে লাগিয়ে গাঁজা পুনর্দখলের পর সেখানেও নতুন করে ইহুদি বসতি স্থাপনের আলোচনা চলছে
নেতানিয়াহু সরকার গাজার প্রসঙ্গে বলেছে আমরা তাদের জোর করে তাড়াচ্ছি না তবে তাদের চলে
যেতে দিচ্ছি। গাজার ২১ লক্ষ অধিবাসীকে বাইরে চলে যেতে উৎসাহিত করার অর্থই হলো অঞ্চলটিকে
ফিলিস্তিনি শূন্য করা। জাউনিস্টদের একটি আলোচিত এবং বিতর্কিত কৌশল হলো আশেপাশের শক্তিশালী
আরব দেশগুলোকে দূর্বল ও খন্ডিত করে ফেলা। যাতে তারা কখনো ইসরাইলের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে
না পারে। ১৯৮২ সালে ইসরাইলের একজন কৌশলবিদ ওডেড ইউনিয়ন তার একটি প্রবন্ধে বলে ইসরাইলকে
সামরিক অর্থ নৈতিক দাপট বজায় রাখতে হলে আশেপাশের আরব রাষ্ট্রগুলোকে বিভক্ত করে ক্ষুদ্র
জাতিগত বা সাম্প্রদায়ভিত্তিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ লেবাননকে খ্রিস্টান
মারোনাইট রাষ্ট্র ও মুসলিম রাষ্ট্রে ভাগ করতে হবে। সিরিয়াকে সুফি, আলাও, সুন্নি, কুর্দি
ইত্যাদি ছোট ছোট টুকরায় ভাগ করতে হবে এবং ইরাককে শিয়া, সুন্নি, কুর্দি রাজ্যে ভাগ করে
তাদের প্রত্যেককে দূর্বল করে দিতে হবে। যাতে তারা ভবিষ্যতে ইসরাইলের জন্য সুবিধাজনক
মিত্র ছায়ায় পরিণত হয়। এই ধারণা পরবর্তীতে ইয়ন পরিকল্পনা নামে পরিচিত পায়। ১৯৭০ এর
দশকে লেবাননের গৃহযুদ্ধ ও ১৯৮২ সালে ইসরাইল লেবাননে আক্রমণের সময় মারোনাইট খ্রিস্টানদের
একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠন করতে পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল। ইসরাইল বহু বছর ধরে সিরিয়ায় শত শত
বিমান হামলা চালিয়েছে এবং দক্ষিণ সিরিয়ায় নিরাপত্তা অঞ্চল তৈরির চেষ্টা করেছে। ২০২৪
সালে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পতনের পর ইসরাইল ট্যাঙ্ক দ্রুত
সীমানা পেরিয়ে সিরিয়ার ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং গোলান মালভূমি লাগোয়া সিরিয়া ভূখন্ডের একের
পর এক সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করতে থাকে। ধারণা করা হচ্ছে দক্ষিণ সিরিয়া জুড়ে দাউদ করিডর
নামে একটি সম্ভাব্য করিডর তৈরি করে ইসরাইল হয়তো এই অঞ্চলে স্থায়ী প্রভাব রাখতে চাচ্ছে
যাতে ভবিষ্যতে সরাসরি সিরিয়ার ভূখন্ড দখল করতে ইসরাইলের সুবিধা হয়। নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক
জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায় বহুকাল আগে থেকেই সে গ্রেটার ইসরাইল ধারণা পোষণ করে আসছে।
যদিও অতীতে নেতানিয়াহু সরাসরি গ্রেটার ইসরাইল শব্দটি উচ্চারণের বিষয়ে সতর্ক ছিল। কিন্তু
২০২৫ সালের আগস্টে নেতানিয়াহু প্রকাশ্যেই গ্রেটার ইসরাইল ধারণার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
নেতানিয়াহুর বাবা বেঞ্জিইয়ন নেতানিয়াহু ছিল জেবোটিনস্কি মতদর্শে বিশ্বাসী এক বুদ্ধিজীবী। যার প্রভাব বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর উপর গভীরভাবে পড়েছে। নেতানিয়াহু ১৯৯৩ সালে তার
লেখা আ প্লেস এমং দ্যা নেশনস ইসরাইল এন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড বইতে দাবি করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের
সময় পশ্চিমা বিশ্ব ইহুদিদের যে স্বদেশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি করেছিল তা পুরোপুরি রক্ষা
করা হয়নি। তার মতে আসলে প্রতিশ্রুতি ছিল জর্ডান নদীর উভয়পাড় সহ সমগ্র প্যালেস্টাইন
ইহুদিদের রাষ্ট্র হবে যদিও নেতানিয়াহুর এই দাবি পুরোটাই ভিত্তিহীন। ইসরাইলের সর্বশেষ
নির্বাচনে নেতানিয়াহু কট্রর ডানপন্থি জোট সরকার গঠন করার পরই বোঝা যায় এবার তার সরকার
ফিলিস্তিনি ভূখন্ডসহ আশেপাশের অঞ্চল দখল করার ক্ষেত্রে আগের চেয়ে অনেক বেশি বেপরোয়া
নীতি গ্রহণ করবে। ২০২৩ সালের অক্টোবারে হামাসের আক্রমণের জবাবে ইসরাইল গাজায় যে ব্যাপক
যুদ্ধ শুরু করে তার মূল উদ্দেশ্যই ছিল স্থায়ীভাবে গাঁজা দখল করা। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি
ইসরাইলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা গাঁজা সিটি পুনর্দখল করার পরিকল্পনা অনুমোদন দেয় ২০২৫
সালের আগস্টে ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রধান দাবিদ বার্নেয়া কাতারের আমিরের
সাথে বৈঠকে স্পষ্ট জানিয়েছে হামাসকে পরাজিত করার জন্য নয় বরং সেখানে ইসরাইলের স্থায়ী
উপস্থিতি গড়ে তোলার জন্য গাঁজা দখলের পরিকল্পনা চলছে। তারমানে গ্রেটার ইসরাইল এখন আর
কোনো প্রান্তিক ধারণা নয়। বরং ইসরাইলের সরকার এই নীতি বাস্তবায়নের জন্য সক্রিয় ভাবে
কাজ করে যাচ্ছে।


No comments