যে কারণে ইরানকে যুদ্ধে হারানো অসম্ভব?
একটু কল্পনা করুন তেলাবি বা রিয়াদের কোনো এক ডিফেন্স
কমান্ড সেন্টারে বসে আছেন একজন জেনারেল। হুট করে সাইরেন বেজে উঠলো। রাডারে দেখা গেল
শত শত মিসাইল ধেয়ে আসছে। কিন্তু এগুলো সাধারণ মিসাইল নয়। এদের মধ্যে কিছু মিসাইল শব্দের
চেয়ে ১৫ গুণ বেশি গতিতে ছুটছে। বায়ুমন্ডলের মধ্যেই একে বেঁকে নিজেদের গতিপথ পরিবর্তন
করছে। আর এমন ভাবে এগিয়ে আসছে যে বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম গুলো
বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে। মাত্র সাত থেকে ১২ মিনিটের মধ্যে এই মিসাইল গুলো তাদের লক্ষ্য
বস্ততে আঘাত হানতে সক্ষম। এই দৃশ্য কোনো সাইন্স ফিকশন সিনেমায় নয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যের
নতুন বাস্তবতা। আর এই বাস্তবতার কেন্দ্রে রয়েছে যে দেশটি তার নাম ইরান । আমরা এমন
একটা দেশের কথা বলছি, মনে করা হয় যার হাতে আজ ছোট বড় মিলিয়ে ৩০০০ এর বেশি ব্যালিস্টিক
ও ক্রুজ মিসাইল রয়েছে । এমন একটি দেশ যা গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ইতিহাসের অন্যতম
কঠোর , অর্থ নৈতিক , প্রযুক্তিগত এবং সাময়িক নিষেধাজ্ঞার শিকার। যার ব্যাংকিং ব্যবস্থা
বৈশ্বিক অর্থ ব্যবস্থা থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন । যাকে আধুনিক প্রযুক্তি থেকে একঘরে করে
রাখার জন্য বিশ্বের তাবর শক্তিগুলো একজোট। তাহলে মূল প্রশ্নটি আরো ভয়ানক হয়ে ওঠে।
এটা কিভাবে সম্ভব হলো ? যে দেশকে প্রযুক্তিগতভাবে পঙ্গু করে দেয়ার কথা ছিলো সে দেশ
কীভাবে হাইপারসোনিক মিসাইলের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি তৈরি করে ফেলল। যে দেশের অর্থ
নীতি নিষেধাজ্ঞার চাপে ঢুকছে তারা কীভাবে হাজার হাজার কোটি ডলারের এই বিশাল সামরিক
প্রকল্প চালিয়ে যাচ্ছে। এটা কোনো সাধারণ গল্প নয়। এটা নিষেধাজ্ঞা, অপমান, জেদ, বুদ্ধিমত্তা
এবং টিকে থাকার এক অবিশ্বাস্য মহাকাব্য। আদ্যপান্তর আজকের পর্বে আমরা বিশ্লেষণ করব
সেইসব কারণ যা ইরানকে নিষেধাজ্ঞার লৌহ প্রাচীর ভেঙ্গে এক অপ্রতিরুদ্ধ সামরিক শক্তিতে
পরিনত করেছে। এই গল্প আপনাকে কেবল অবাক করবে না, ভাবতেও বাধ্য করবে। এই গল্পের শেকর
বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৯৭৯ সালে। ইরানে ঘটে গেল ইসলামিক বিপ্লব। মার্কিন
সমর্থিত শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহালবির পতন ঘটিয়ে ক্ষমতায় এলেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেন। এর আগে শায়ের আমলে ইরান ছিল আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং মার্কিন অস্ত্রের সব চেয়ে
বড় ক্রেতাদের একজন। এজন্য তাদের হাতে ছিল এফফোর চমকেটের মতো সেই সময়ের সবচেয়ে আধুনিক
যুদ্ধবিমান। কিন্তু বিপ্লবের পর এই চিত্র রাতারাতি বদলে গেল। বন্ধু পরিণত হলো ক্রুর
শত্রুতে। তেহেরানে মার্কিন দূতাবাসে জিম্মি সংকট তৈরি হওয়ার পর আমেরিকা ইরানের উপর
প্রথম দফা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং সকল প্রকার সামরিক ও অর্থ নৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে।
ইরানের জন্য আসল অগ্নিপরীক্ষা শুরু হয় ১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বরে যখন প্রতিবেশি দেশ ইরাকের
প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ইরান আক্রমণ করে বসেন। এই যুদ্ধ চলেছিল দীর্ঘ আট বছর। এই
সময়ে আন্তর্জাতিক বিশ্ব ইরানের উপর একপ্রকার অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা করে রেখেছিল। অর্থাৎ, ইরান কারো কাছ থেকে বৈধভাবে অস্ত্র বা তার যন্ত্রাংশ কিনতে পারছিল না। অন্যদিকে,
সাদ্দাম হোসেনের ইরাক, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ফ্রান্স এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশ থেকে অত্যাধুনিক
অস্ত্রশস্ত্র , যুদ্ধবিমান এবং বিশেষ করে স্কার্ট মিসাইল পাচ্ছিল। যুদ্ধের এক পর্যায়ে
সাদ্দাম হোসেন ইরানের সাধারণ শহরগুলোকে লক্ষ্য করে মিসাইল হামলা শুরু করে। যা ইতিহাসে
ওয়ার অফ দ্যা সিটিস নামে পরিচিত। তেহরান, কোম ইসফানের মতো শহর গুলোর উপর একের পর
এক স্কার্ড মিসাইল এসে পড়ছিল। সাধারণ মানুষ মারা যাচ্ছিল। ঘরবাড়ি ধ্বংস হচ্ছিল।
ইরানের বিমান বাহিনী ছিল পুরনো এবং যন্ত্রাসের অভাবে প্রায় অক্যেজ্য। তাদের হাতে সেই
হামলা ঠেকানোর বা পাল্টা জবাব দেওয়ার মতো কোনো প্রযুক্তি ছিল না। এই চরম অসহায়ত্বই
ইরানের সাময়িক এবং রাজ নৈতিক নেতৃত্বের মনে দুটি বিষয় গেঁথে দেয়। প্রথমত, আন্তর্জাতিক
আইন বা অন্য কোনো দেশের উপর ভরসা করে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। দ্বিতীয়ত
আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি নিজেদেরই অর্জন করতে হবে। যাকে বলে সামরিক স্বনির্ভরতা। এই যুদ্ধের ধ্বংস স্তুপের মধ্য থেকে জন্ম নিয়েছিল ইরানের মিসাইল প্রোগ্রামের স্বপ্ন। একটি স্বপ্ন যা তাদের টিকে থাকার একমাত্র
উপায় বলে মনে হয়েছিল। ইরাকের সাথে যুদ্ধ চলাকালীনই মরিয়া হয়ে উঠে ইরান। তারা বুঝতে পারছিল মিসাইলের জবাব দিতে হবে মিসাইল
দিয়েই। অনেক চেষ্টার পর তারা গোপনে লিবিয়া এবং উত্তর কোরিয়ার কাছ থেকে হাতে গোনা কিছু
স্কার্ট বি মিসাইল কেনে কিন্তু এই সংখ্যা এতই কম ছিল যে তা দিয়ে ইরাকের মিসাইল বৃষ্টির
মোকাবেলা করা সম্ভব ছিল না । তখন ইরানের ইসলামিক রেভলুশনারি গার্ড কর্ভস বা আইআরজিসি
এর ইঞ্জিনিয়াররা এক দুরসাহসিক এবং যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিলেন। তারা এই কিনে আনা
স্কার্ট মিসাইল গুলোকে নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন।
এই প্রক্রিয়ার নাম রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং। সহজ ভাষায় একটি জটিল যন্ত্রকে খুলে
এর প্রতিটি অংশ, নকশা, উপকরণ এবং কার্যপ্রণালী পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে বিশ্লেষণ করে সেটির
আদলে নতুন করে সেই যন্ত্র তৈরি করা। এই বিশাল কর্ম যজ্ঞের নেতৃত্বে ছিলেন একজন দূরদর্শী
কমান্ডার হাসান তেহরানী মোকাদ্দাম। যাকে আজ ইরানের মিসাইল প্রোগ্রামের জনক হিসেবে
সন্মান করা হয়। তিনি এবং তার নেতৃত্বাধীন একদল তরুণী ইরানী ইঞ্জিনিয়ার প্রায় শূন্য
থেকে কাজ শুরু করেন। তাদের কাছে না ছিল পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত জ্ঞান না ছিল প্রয়োজনীয়
উন্নত যন্ত্রাংশ। মাথার উপরে ছিল পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কড়া নজরদারি কিন্ত
তাদের ছিল অদম্যচেদ এবং জাতীয়তা বাদের অনুপ্রেরণা। তাদের এই পথচলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
সহযোগী ছিল উত্তর কোরিয়া। উত্তর কোরিয়াও তখন আন্তর্জাতিক ভাবে বিচ্ছিন্ন এবং তাদেরও
সোভিয়েত স্কার্ড মিসাইলের উপর ভিত্তি করে নিজস্ব মিসাইল তৈরির অভিজ্ঞতা ছিল। দুটি
বিচ্ছিন্ন দেশ একে অপরের প্রয়োজনে বন্ধু হয়ে ওঠে। ইরান তার তেলের অর্থ দিয়ে উওর কোরিয়াকে
সাহায্য করত আর বিনিময়ে উত্তর কোরিয়া মিসাইল প্রযুক্তি ইরানের সাথে ভাগাভাগি করেছিল। অবশেষে এই কঠোর পরিশ্রম সফল হয়। স্কার্ট বিয়ের উপর ভিত্তি করে ইরান তৈরি করে তাদের
প্রথম দেশীয় মিসাইল শাহাব ওয়ান। এরপর আসে শাহাব টু এবং তারপর শাহাব থ্রি। শাহাব থ্রি
ছিলো মূলত উত্তর কোরিয়ার নোডং ওয়ান মিসাইলের উন্নত সংস্করণ । যার পাল্লা ছিল প্রায়
১৩০০ কিলোমিটার। এই মিসাইলটি প্রথমবারের মতো ইসরাইল এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন
সামরিক ঘাঁটিগুলোকে ইরানের অস্ত্রের আওতায় নিয়ে আসে। এটা ছিল ইরানের জন্য এক বিশাল
মনস্তাত্বিক এবং কৌশল গত বিজয়। তারা বিশ্বকে দেখিয়ে দিল যে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তাদের
আটকে রাখা যাবে না। হাসান তেহরানী মুকাদ্দাম ২০১১ সালে এক মিসাইল ঘাঁটি বিস্ফোরণে মারা
যান। কিন্তু তার দেখানো পথেই ইরান আজ এই অবস্থানে এসে পৌঁছেছে। ২০০০ এর দশকের শুরুতে
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ চরমে পৌঁছায়। আমেরিকা, জাতিসংঘ
এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন একজোট হয়ে ইরানের উপর এমন কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যা আগে কোনো
দেশের উপর করা হয় নি। এই নিষেধাজ্ঞা গুলো ছিলো বহুমূখী। প্রথমতো অর্থ নৈতিক নিষেধাজ্ঞা। বিশ্ববাজারে ইরানের তেল রপ্তানি প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হয়। সুইফট এর মতো
আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং সিস্টেম থেকে ইরানকে বাদ দেওয়া হয়। যার ফলে তাদের পক্ষে আন্তর্জাতিক
বাণিজ্য করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এরপর আসে সামরিক ও প্রযুক্তিগত নিষেধাজ্ঞা। ইরানের
কাছে যেকোনো ধরনের অস্ত্র এবং সামরিক প্রযুক্তি বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। সবচেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ ছিলো জুয়েলউস প্রযুক্তির উপর নিষেধাজ্ঞা। অর্থাৎ যে সকল উপকরণ ও প্রযুক্তি
সামরিক ও বেসামরিক উভয় কাজে ব্যবহার করা যায় যেমন, উন্নতমানের কার্বণ ফাইবার যা মিসাইলের
কাঠামো এবং টেনিস র্যেকেট উভয় তৈরিতেই লাগে। উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন জিপিএস সিস্টেম,
আধুনিক প্রসেসর যা গেমিং কনসোল এবং মিসাইল গাইডেন্স সিস্টেম উভয়টিতে ব্যবহৃত হয় সেগুলোর
উপর বসানো হয় কড়া নজরদারি। পশ্চিমাদের উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার। ইরানের অর্থনীতি এবং
প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে সম্পূর্ন পঙ্গু করে দেওয়া। কিন্তু ইরান এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায়
এক অভিনব এবং বহুস্তরীয় কৌশল গ্রহণ করে। ইরান বিশ্বজুড়ে শেল কোম্পানি বা কাগজের কোম্পানির
এক বিশাল ও জটিল চাল তৈরি করে। এই কোম্পানিগুলো চীন, তুরষ্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত এমনকি
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সাধারণ বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিবন্ধিত ছিল। তাদের কাজ
ছিল বিভিন্ন দেশ থেকে অল্প পরিমানে জুয়েল ইউজ সামগ্রী কেনা এবং সেগুলোকে বিভিন্ন হাত
ঘুরিয়ে চালানোর বিষয়বস্ত পরিবর্তন করে ইরানে পাচার করা। এই নেটওয়ার্ক এতটাই বিকেন্দ্রীভূত
এবং জটিল ছিল যে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পক্ষেও এর সম্পূর্ণ নাগাল পাওয়া ছিল
প্রায় অসম্ভব। ইরান দ্রুতই বুঝতে পারে যে বাইরে থেকে প্রযুক্তি আনা হয়তো কঠিন। কিন্তু
জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব। তারা তাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় আনে আমূল পরিবর্তন। দেশের সেরা
ছাত্রদের সরকারি খরচে বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে পাঠানো হয় পদার্থবিদ্যা, রসায়ন এবং বিভিন্ন ইঞ্জিনিয়ারিং শাখায় উচ্চ শিক্ষা নিতে। দেশের ভেতরে শরীফ ইউনিভার্সিটি
অফ টেকনোলজি, মালেক আশতার ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজির মতো প্রতিষ্ঠান গুলোকে বিশ্বমানের
গবেষণা কেন্দ্রে পরিণত করা হয়। এর ফলে ইরানে নিজস্ব একদল অত্যন্ত মেধাবী বিজ্ঞানী
ও প্রকৌশলী তৈরি হয় । যারা বিদেশি প্রযুক্তির উপর নির্ভর না করে নিজেরাই নতুন প্রযুক্তি
উদ্ভাপন করার সক্ষমতা অর্জন করে। তারা কেবল নকল করাতেই থেমে থাকেনি বরং মৌলিক গবেষণাতেও
মন দেয় । এদিকে ইসলামিক রেভুলেশনারি গার্ড করর্বস কেবল একটি সামরিক বাহিনী নয়। এটি
ইরানের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে দেশের বৃহত্তম
কনস্ট্রাকশন কোম্পানি খাতাম আল আম্বিয়া, টেলিকমিউনিকেশন, তেল এবং গ্যাস ক্ষেত্র।
এই বিশাল অর্থ নৈতিক সাম্রাজ্য থেকে অর্জিত অর্থ সরাসরি তাদের সামরিক গবেষনা ও উন্নয়ন
প্রকল্পে যায়। এর ফলে সরকারি বাজেটের উপর নির্ভর না করে এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক নিষেধাজ্ঞা
পাশ কাটিয়ে তারা মিসাইল, ড্রোন এবং পারমানবিক কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান
নিশ্চিত করতে পেরেছিল। এছাড়া ইরান খুব ভালোভাবেই জানতো যে তারা প্রচলিত যুদ্ধে আমেরিকা
বা ইসরাইলের মত শক্তির সাথে কখনোই পারবে না। তাদের নেই অত্যাধুনিক বিমান বাহিনি রণতরী
স্টেলথ যুদ্ধবিমান বা শক্তিশালী বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। তাই তারা এমন যুদ্ধরীতি
গ্রহণ করে যা শত্রুর শক্তির জায়গায় আঘাত না করে তার দূর্বল আঘাত করতে পারবে। এই অপ্রতিসম
যুদ্ধরীতির মূল অস্ত্র গুলোর একটি হচ্ছে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইল। যা তাদের দূর
পাল্লার বিমান বাহিনীর বিকল্প হিসেবে কাজ করে। এরপর আছে সশস্ত্র ড্রোন যা কম খরচে
সবচেয়ে শত্রুর গভীরে হামলা চালাতে বা নজরদারিতে সক্ষম। এছাড়া রয়েছে প্রক্সি নেটওয়ার্ক।
যা এক্সিস অফ রেজিস্টেন্স বা প্রতিরোধের অক্ষ নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে লেবাননের হিজবুল্লাহ
ইয়েমেনের হুতি, ইরাক ও সিরিয়ার শিয়া মিলিশিয়াদের অস্ত্র, অর্থ এবং প্রযুক্তি দিয়ে
শক্তিশালী করা হয়। ফলে, ইরান নিজের ভূখন্ড থেকে বহু দূরের শত্রুর মোকাবেলা করতে পারে।
সেই সাথে রয়েছে নৌবাহিনীর সোয়ার্ম ট্যাকটিক্স। হরমুজ প্রণালীতে ছোট কিন্তু দ্রুতগামী
স্পিডবোর্ড দিয়ে শত্রুর বড় যুদ্ধ জাহাজকে ব্যতিব্যস্ত রাখার একটি কার্যকরী কৌশল। এইসব
কৌশলের সমন্বয়ে ইরান নিষেধাজ্ঞার ফলে তৈরি হওয়া শূন্যস্থান পূরণ করে এক নতুন ধরনের
প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। প্রথমদিকে ইরানি মিসাইল গুলো, যেমন সাহাব সিরিজ ছিল
মূলত প্রতিশোধের অস্ত্র। এগুলো নির্ভূলতা ছিল কম এবং এগুলো দিয়ে বড় শহর বা এলাকাকে
লক্ষ্যবস্ত করা হতো। কিন্ত গত এক দশকে ইরান তাদের মিসাইল প্রযুক্তিতে এক অবিশ্বাস
উন্নতি ঘটিয়েছে যা অনেক সামরিক বিশেষজ্ঞকেও অবাক করে দিয়েছে। ইরানের আগের মিসাইলগুলো
ছিল লিকুইড ফুয়েল বা তরল জ্বালানীর। এই জ্বালানি উৎক্ষেপণের ঠিক আগে ভরতে হতো। যা
অত্যন্ত সময় সাপেক্ষ ও বিপদজনক এবং এর প্রস্ততি পর্ব সহজেই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ধরা
পড়তো। ইরানি দুর্বলতা কাটাতে সলিড ফুয়েল প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন করে। সেজিল, ফাত্তা
এর মত আধুনিক মিসাইলগুলো সলিড ফুয়েল জ্বালানিতে চলে। এ মিসাইলগুলো জ্বালানিসহ প্রস্তুত
অবস্থায় ভূগর্ভস্থ সাইলো বা ভ্রাক্ষ্মমান লঞ্চারে লুকিয়ে রাখা যায় এবং যেকোনো মূহূর্তে
মাত্র কয়েক মিনিটের নোটিশে উৎক্ষেপণ করা যায়। এই সুট এন্ড স্কুট সক্ষমতা তাদের মিসাইল
শক্তিকে প্রায় অপ্রতিরোদ্ধ করে তুলেছে। এছাড়া ইরান তাদের নতুন প্রজন্মের মিসাইল গুলোতে
অত্যাধুনিক টার্মিনাল গাইডেন্স সিস্টেম এবং ম্যানুভারেবল রিএন্ট্রি ভেহিককেল যুক্ত
করেছে। এর মানে হলো মিসাইলের ওয়ারহেডটি বায়ু মন্ডলের পুনঃপ্রবেশের পর শেষ মূহূর্তেও
নিজের গতিপথ পরিবর্তন করে লক্ষ্যবস্ততে নিখুত ভাবে আঘাত হানতে পারে। ২০১৯ সালে সৌদি
আরবের আরামকো তেল ক্ষেত্রে ড্রোন ও ক্রুজ মিসাইল হামলা এবং ২০২০ সালে ইরাকের আইন আল
আসাদ মার্কিন গাড়িতে ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলা এই পিন পয়েন্ট অ্যাঁকুরেসি জ্বলন্ত প্রমাণ। এরপর আসে ইরানের গেইম চেঞ্জার ফাতা ক্ষেপণাস্ত্র। ২০২৩ সালের জুন মাসে ইরান বিশ্বকে
স্তব্ধ করে দিয়ে তাদের প্রথম হাইপারসোনিক মিসাইল ফাতা উন্মোচন করে। হাইপারসোনিক মিসাইল
শব্দের চেয়ে পাঁচ গুণেরও বেশি গতিতে চলে এবং প্রচলিত ব্যারিস্টিক মিসাইলের মতো নির্দিষ্ট
পথে না চলে বায়ুমন্ডলের মধ্যেই একে বেঁকে চলতে পারে। ইরানের দাবি অনুযায়ী ফাতা-১ শব্দের
চেয়ে ১৫ গুণ বেশি গতিতে ছুটতে পারে। এর অর্থ হলো আমেরিকার প্যাট্রিয়ট থার্ড বা ইসরাইলেরো
– ৩ এর মতো বিশ্বের সেরা মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম গুলোর
পক্ষেও এই মিসাইলকে ট্র্যাক করে ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব। এর কয়েক মাস পরেই তারা ফাতা
-২ উন্মোচন করে যা একটি হাইপারসোনিক গ্লাইড ভেহিকেল। এটি আরো বেশি অনির্দেশ্য পথে
চলতে পারে। এই প্রযুক্তি ইরানকে এমন এক ক্ষমতা দিয়েছে যা শুধুমাত্র আমেরিকা, রাশিয়া
এবং চীনের মতো হাতে গোনা কয়েকটি দেশের কাছেই আছে। মিসাইলের পাশাপাশি ইরান ড্রোন প্রযুক্তিতেও
বৈপ্লবিক সাফল্য পেয়েছে। তাদের শাহেদ ১৩৬ কামি কাজের ড্রোনগুলো অত্যন্ত সস্তা, খরচ
প্রায় ২০,০০০ ডলার। তৈরি করা সহজ এবং বিপুল সংখ্যায় ব্যবহার করা যায়। এর কৌশল হলো
সোয়র্ম অ্যাঁটাক বা ঝাঁকে ঝাঁকে হামলা চালিয়ে শত্রুর মিলিয়ন ডলারের এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম
কে পরাস্ত করা। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার এই ড্রোন ব্যবহার প্রমাণ করে যে ইরানের অস্ত্র
প্রযুক্তি এখন কেবল আঞ্চলিক নয় বরং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতেও বড় ভূমিকা রাখছে। তাহলে
এই দীর্ঘযাত্রার সারসংক্ষেপ কি? ইরানের এই অভাবনীয় সামরিক উথানের পেছনে কোন একটি জাদুকরী
কারণ নেই। এটি আসলে কয়েকটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে। ঐতিহাসিক বাধ্যবাধকতা ও জাতীয়তাবাদী
জেদ, রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে শুরু করে মৌলিক গবেষণার মাধ্যমে অর্জিত দেশীয় উদ্ভাবন,
আইআরজিসি এর মত শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের অর্থ নৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাহিত্য শাসন, মানব
সম্পদের উপর দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ এবং একটি সুস্পষ্ট অপ্রতিসম যুদ্ধ রীতি। এখানে লুকিয়ে
আছে এক বিশাল প্যারাডক্স। যে নিষেধাজ্ঞাগুলো ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক উচ্চাকাক্কমাকে
অংকুরে বিনাশ করার জন্য আরোপ করা হয়েছিল সেই নিষেধাজ্ঞাই পরোক্ষভাবে ইরানকে একটি স্বাবলম্বী
উদ্ভাবনী এবং আগের চেয়ে অনেক বেশি বিপদজনক সামরিক শক্তিতে পরিণত হতে বাধ্য করেছে।


No comments