ডলার কিভাবে বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করে ?
আপনি যদি এখন ঘরে বসে টাকা ছাপাতে শুরু করেন সেটা হবে জাল টাকা। ধরা পড়লে শাস্তি নিশ্চিত। কিন্তু যদি সবাইকে টাকা ছাপানোর অধিকার দেওয়া হতো তখন কী হতো ? সবার হাতে কোটি কোটি টাকা। কিন্তু সেই টাকার আর কোনো মূল্য থাকতো না। আসলে মুদ্রার মূল্য এর বিরলতা ও বিশ্বাসের উপর নির্ভরশীল। যদি প্রচুর টাকা হুট করে বাজারে এসে যায় পণ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়ে টাকা নিজের মান হারায়। তবে টাকা ছাপানো কিন্তু বৈধ মাত্র একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য । বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে এই ক্ষমতা রয়েছে। তারা চাইলে অর্থ নীতি অনুযায়ী নতুন টাকা তৈরি করে বাজারে ছাড়তে পারে । সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদের মনে হয় সরকারের এই ব্যবস্থা নিশ্চয় সুচিন্তিত ও নিয়ন্ত্রিত । কিন্তু বাস্তবে এই ফিয়াড অর্থব্যবস্থা নানা লুকানো জটিলতা ও ত্রুটিতে ভরা। যা আপনার আমার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে । ধরুন আপনি ব্যাংক থেকে এক লাখ টাকা ঋণ নিলেন। ভাবতে পারেন এই টাকা নিশ্চয়ই অন্য কারো জমা রাখা টাকা থেকেই দেওয়া হলো। বাস্তবে ব্যাপারটা এত সহজ নয়। ব্যাংক কম্পিউটারের শুধুমাত্র একটি সংখ্যা লিখেই সেই টাকা তৈরি করে। ব্যাংকের কাছে জমা আছে ১০ টাকা। ব্যাংক সে ১০ টাকার বিপরীতে আরো ১০০ টাকা ঋণ হিসেবে বানিয়ে ফেলতে পারে। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যাংকিং। অর্থাৎ যতটুকু টাকা জমা আছে তার চাইতে বহুগুণ বেশি টাকা ঋণ দিয়ে বাজারের নতুন টাকা সরবরাহ করা সম্ভব। অর্থাৎ কাগজে না ছাপিয়েই ডিজিটালি তৈরি হচ্ছে টাকা। ব্যাংকের আসলে কোন লস নেই। যা আছে সবই লাভ। তবে এরপরও কিছু কিছু ব্যাংক ভুল পলিসি , দুর্নীতি কিংবা অতিরিক্ত লোভে দেউলিয়া ঘোষণা করলেও ঘুরে ফিরে সেই টাকা সুদ দিতে হয় সাধারণ জনগণকেই। সেরা ট্যাক্স দিয়েই হোক বা আলুর কেজি ৪২০ টাকা দিয়ে কিনে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কখনোই দেউলিয়া হবে না। কারণ তার কাছে টাকা না থাকলেও আছে টাকা ছাপানোর লাইসেন্স। আজকের কাগজের নোটের ইতিহাস বুঝতে গেলে আমাদের অনেক পেছনে ফিরে যেতে হবে। প্রাচীন কালে মানুষ পণ্য দিয়ে পণ্য বিনিময় করতো। যাকে বাটার পদ্ধতি বলে। একজন কৃষক জেলের কাছ থেকে মাছ নিচ্ছেন বিনিময়ে তাকে সবজি দিচ্ছেন। কিন্তু এই ব্যবস্থাতেও সমস্যা ছিল। জেলের যদি সবজির দরকার না থাকে। এই অসুবিধা থেকেই মানুষ সোনা, রুপা, তামা এমনকি লবণ বা ঝিনুকের খোল বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার শুরু করলো। কারণ এগুলো তো সবার দরকার ছিল এবং সহজে বিনিময় করা যেত। কিন্তু এখানেও একটি সমস্যা রয়ে গেল। যে জিনিসের যত সহজ লভ্য তার মূল্য তত কমে যায়। সমুদ্র তটে প্রচুর মিললে ঝিনুকের খোল বা কোরির মূল্য নামতে থাকে। কাজেই মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত জিনিসটি দুষ্প্রাপ্য হওয়া দরকার। না হলে সবাই সহজেই পেয়ে যাবে এবং এর মূল্যমান বিশ্বাস যোগ্য থাকবে না। এই কারণে মানুষ দৃষ্টি ফেরালো দুষ্প্রাপ্য ধাতুর দিকে। বিশেষ করে সোনা এবং রূপা। প্রাচীনকালে মিশরীয় সভ্যতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সমাজে সোনাপার চাকতি বা অলংকার বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয় হতো। সোনা, রূপা আকর্ষণীয় স্থায়ী এবং সীমিত পরিমাণে পাওয়া যায়। তাই নিজস্ব মূল্যও ছিল। তবে সমস্যা ছিল এটাও সহজে পাওয়া যায় না। সবার চাহিদা মেটানো মুশকিল। প্রতিবার লেনদেনে ওজন করে থাকার ঝামেলাও ছিল। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে এই সমস্যার সমাধানের প্রথম ঘাতব মুদ্রা বা কয়েন চালু হয়। তাতেই বিশাল পরিবর্তন এল। তখন মুদ্রার মূল্য স্বয়ং ধাতুর মূল্য। এক গ্রাম স্বর্ণের কয়েন মানে সত্যি এক গ্রাম স্বর্ণ যা হাতে নিলেই যাচাই করা যায়। শাসকেরা বুঝে গেলেন যার কাছে বেশি স্বর্ণ মুদ্রা তার ক্ষমতাও তত বেশি। শুরু হয়ে গেল স্বর্ণ এবং রূপা সংগ্রহের প্রতিযোগিতা। কিন্ত স্বর্ণ ও রূপা যেমন দুর্লভ তেমন মুদ্রার চাহিদাও বাড়ছিল। ফলে চাহিদা মেটাতে গিয়ে রাজারা এক ফন্দি আটলেন। মুদ্রা পাতলা করে আরো ধাতু মেশানো শুরু হল। যাতে বেশি কয়েন বাড়ানো যায়। এর ফলে ধীরে ধীরে মুদ্রার আসল মূল্যমান কমতে লাগালো । অথচ বাজারের মূল্য কিন্তু একই থেকে গেল। ওদিকে এতেও মন ভরছিলো না রাজা-রাণীদের। অনেক ওজনের কারণে একসাথে অনেক মুদ্রা বহন করাও ছিল ঝামেলার। তখন উদ্ভব হল কাগজের সার্টিফিকেট বা প্রাপ্তি স্বীকার পত্র। প্রাচীন আইওইউ বলতে পারেন রাজা বা শাসকের স্রীমহ সহ একটি কাগজ যেখানে লেখা আছে অমুক ব্যক্তির কাছে আমি এত সম্পদের ঋণী। এইরূপ বিনিময় যোগ্য দলিল। দেখা গেল রাজকীয় সিলমহর থাকা এসব কাগজেও সবাই বিশ্বাস করছে। এটি থাকলে ভবিষ্যতে দাবিকৃত পরিমাণ স্বর্ণ বা সম্পদ পাওয়া যাবে। ধীরে ধীরে এই কাগজের দলিলই বিনিময়ের মাধ্যম হয়ে উঠলো। ধাতব মুদ্রার প্রয়োজন কমতে লাগলো। শেষমেষ দেখা গেল স্বর্ণ , রূপা কোষাগারেই পড়ে আছে। আর বাজারে৬ ঘুরছে ওই কাগজ। যার নিজের মূল্য নেই। কিন্তু সবাই মানছে। কারণ শাসক তাই বলেছে। এভাবেই টাকা হয়ে উঠলো এক ধরণের মায়া। তার নিজের তেমন ভৌত মূল্য নেই কিন্তু আমরা মানি কারণ রাষ্ট্র বলে আর বিশ্বাস করি আর এই বিশ্বাসই টাকার আসল শক্তি আবার সবচাইতে বড় দুর্বলতাও। পৃথিবীর সবচাইতে দামি নোট হিসেবে এখনো চালু আছে ১০ হাজার সিঙ্গাপুরিয়ান ডলারের নোট এই নোট ছাপার জন্য বাংলাদেশি ২০ টাকারো কম অর্থ লাগলেও ফিয়াড কারেন্সির বরাতে বাজারে এখন এর মূল্য প্রায় ৪ লক্ষ ৯ হাজার টাকা কিন্তু কি এই ফিয়াড কারেন্সি ফিয়াড হচ্ছে ল্যাটিন শব্দ যার অর্থ লেট ইট বি ডান অর্থাৎ এটি সম্পাদিত হোক। এটা হলো অর্থের মূল্যমান নির্ধারণ করে সরকারের ডিক্রি বা আদেশ। আর সেই প্রাচীন আমলের রাজা বাচ্চাদের মত নেই সরকারও চাই প্রচুর পরিমাণে অর্থ। কারণ আপনার কাছে যত অর্থ থাকবে ততই আপনার ক্ষমতা বাড়বে। আর এই ফিয়ারড কারেন্সি সিস্টেমে প্রায় সারা বিশ্ব অনুসরণ করে। কাগজের টাকা চালু হলেও দীর্ঘদিন ধরে এর মূল্য ছিল স্বর্ণের সাথে বাধা । প্রত্যেকটি নোটের বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ সোনা ভান্ডারে থাকতো । কিন্তু ক্রমেই রাষ্ট্র ব্যবসায়ীদের আরো টাকার প্রয়োজন হলো যা সোনার মজুদ দিয়ে মেটানো কঠিন। এমন অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যবস্থা বিকশিত হয়। ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড। এটি মূলত ইংল্যান্ডের যুদ্ধঋণ মেটাতে একদল ব্যাংকারের উদ্যোগে তৈরি হয়। সরকারি চাহিদা মত কাগজের টাকা অথবা সঞ্চয়পত্র ইস্যু করে ধার দেওয়া এবং পরে করের টাকায় বা সোনা দিয়ে তার ভারসাম্য রক্ষা করা। এই প্রবণতা আমেরিকাতেও আসতে দেরি হয়নি। তবে আমেরিকান জনগণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারণা শুরুতে পছন্দ করেনি। তারা ইউরোপের উদাহরণ দেখে ভয় পেত যে এমন ব্যাংক অর্থনীতিকে নিজেদের স্বার্থে নাড়াচাড়া করবে। ১৯১০ সালের শীতকাল নিউইয়র্ক থেকে একটি ব্যক্তিগত ট্রেন চুপি চুপি ছুটল জর্জি জেকেল আইল্যান্ডের দিকে। যাত্রীরা মাত্র সাত জন। ব্যাংক জগতের বড় বড় খেলোয়াড় আর প্রভাবশালী সিনেটর নেলসন আলট্রিচ টিপের নির্জনে টানা নয় দিন তারা দরজা জানলা বন্ধ করে আলোচনা চালালেন পরে জানা গেল সেখানে লেখা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যত কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যবস্থার খসড়া। প্রথমে খসড়াটির নাম ছিল আল্ট্রিজ বিল অল্ট্রিচের ব্যাংক প্রীতি দেখে অনেকেই সন্দেহীন ছিলেন। তাই কৌশলের নাম বদলে রাখা হলো ফেডারেল রিজার্ভ অ্যাঁক্ট। সংবাদপত্রে ছাড়ানো হলো বড় ব্যাংকাররা নাকি এই আইন চাই না। সাধারণ মানুষও ভেবে নিল ব্যাংকাররা যেহেতু চাই না তাহলে মনে হয় আইনটা জনগণের পক্ষেই যাবে। ব্যাংকাররা শুধু এখানেই খ্যান্ত দেয়নি। তারা কংগ্রেসম্যানদের বোকা বানানোর জন্য এই বিলে কিছু ধারাও অ্যাঁড করেছিল। যেখানে দেখানো হয়েছিল তাদের ক্ষমতা খুবই কম থাকবে। কিন্তু বিল পাশ হওয়ার সাথে সাথেই এইসব ধারা তারা বেমালুম গায়েব করে দেয়। ১৯১৩ সালের ২৩ শে ডিসেম্বর বড়দিনের ঠিক আগে যখন কংগ্রেস ছুটিতে বেল্টি চুপি সারে পাশ হয়ে গেল এর পরিণতি একটি বেসরকারি চরিত্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অপরিমেয় ক্ষমতা পেল টাকা ছাপা সরকারের ঋণ জোগানো সবই তাদের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল শুরুতে প্রতিটি ডলারের পেছনে স্বর্ণ রাখার নিয়ম ছিল কিন্তু ধীরে ধীরে তা শিথিল হয় ফলে ঋণই হয়ে উঠলো অর্থনীতির ইঞ্জিন যেখানেই এই মডেল চালু হলো সেখানেই দেখা দিল প্রবল আয় বৈষম্য। ধনীরা আরো ধনী হলো। মূল্যস্ফীতির বোঝা পড়ল সাধারণ মানুষের ঘাড়ে। যুক্তরাষ্ট্র ফেডারেল রিজার্ভ চালু করলেও প্রথমে স্বর্ণমান পুরোটা ছাড়েনি। হাতে যত সোনা ঠিক ততটাই ডলার হতো। যুদ্ধরজন ইউরোপ যখন আমেরিকা থেকে অস্ট্রোয়ার খাদ্য কিনতে লাগলো সোনার স্রোত বইল আমেরিকায়। ১৯৪৪ সালের ব্রিটেনের উডস সম্মেলনে ঠিক হল ডলারই হবে বৈশিক মুদ্রা আর যেকোনো দেশ চাইলেই ৩৫ ডলার দিয়েই প্রতিটি আউট সোনা পাবে সবাই মানলো কারণ বলতে গেলে সব সোনাই তখন আমেরিকার ভান্ডারে সমস্যা শুরু হয় ভিয়েতনাম যুদ্ধ ও আমেরিকার নিজস্ব খরচ বাড়ায় তারা ডেডার্সের ডলার ছাপা শুরু করলো। কিন্তু সোনার ভান্ডার তো আর বাড়ে না বিশ্বজুড়ে ডলার ছড়িয়ে পড়ছিল বিদেশী সরকারগুলো বুঝতে পারছিল যে মার্কিন ট্রেজারিতে এত সোনা নেই যা দিয়ে সব ডলারের দাবি মেটানো যাবে। ফ্রান্স সহ কিছু দেশ ডলার ফিরিয়ে সোনা চেয়ে বসলে ভান্ডার ফাঁকা হতে থাকে। শেষমেষ ১৯৭১ সালের ১৫ই আগস্ট প্রেসিডেন্ট নিসন সরাসরি ঘোষণা করলেন ডলারের বদলে আর সোনা দেওয়া হবে না। হাজার বছরের স্বর্ণমান এক ধাক্কায় শেষ। সব মুদ্রায় হয়ে গেল লিখাত ফিয়াট। কাগজ কালিয়া সরকারের কথা ওদিকে আমেরিকার ডলারের বিপরীতে সোনার যে দাবি সেই দাবির পুরো ১৮০ ডিগ্রি বিপরীতের এই সিদ্ধান্তে বিশ্বের প্রায় সব দেশের তখন মাথায় হাত তারা বিকল্প পন্থা খুলতে শুরু করে দিয়েছে। এই ডামাডলে ডলারের উপর বিশ্বাস টিকিয়ে রাখতে আমেরিকা নতুন জাল চাল। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে চুক্তি করে ঠিক করল তেল কেবল ডলারে কেনাবেচা হবে। যাকে বলে পেট্রো ডলার ব্যবস্থা। বিশ্বব্যাংক আইএমএফ এও ডলারের দাপট থাকলো। তাই তেল কিনতে হোক বা ঋণ পেতে। সব দেশকে ডলার জমা রাখা বাধ্যতামূলক। কেউ কেউ এই দৌরত্ব থামাতে চেয়েছিল। সাদ্দাম হোসেন তেল ইউরোতে বিক্রি করার চেষ্টা করেছিলেন। গাদ্দাফি ভাবছিলেন স্বর্ণের সমর্থিত আফ্রিকান মুদ্রা। শেষ পর্যন্ত দুজনেরই পরিণতি ছিল মর্মান্তিক। ইতিহাস যেন কানে কানে বলে দেয় ডলারের রাজত্ব চ্যালেঞ্জ করলে একাই বহন করতে হয় তার খরচ। স্বর্ণমান ছেড়ে দেওয়ার পর দুনিয়ার টাকা এখন পুরোপুরি ঋণ নির্ভর কাগজ বা ডিজিটাল সংখ্যা। সরকার খরচ বাড়াতে চাইলে বন্ড ছাপে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেই বন্ড কিনে নতুন টাকা তৈরি করে। বাণিজ্যিক ব্যাংকও ঋণ দিয়েই নতুন টাকা জন্মায়। প্রথমেই লাভ পায় সরকার, ব্যাংক আর বড় বড় বিনিয়োগকারী। কারণ তখনো বাজারে দাম বাড়েনি। পরে যখন মুদ্রা সবার হাতে ঘরে পণ্যের দাম ততদিনে চড়ে বসে এবং বোঝাটা এসে পড়ে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে। ক্যান্টিল এফেক্টের এই খেলায় ধনীরা আরো ধণী হয়। সঞ্চয়শীল মধ্যবিত্তের পকেট হালকা হতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের দেনার গল্পই উদাহরণ। ১৯৮১ তে জাতীয় ঋণ ছিল প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলার। এই প্রতিবেদন লেখার সময় আস্তা প্রায় ৩৭ ট্রিলিয়ন ডলার। জিডিপি আর ঋণের রেশিও ১২৪। অর্থাৎ দেশের জিডিপি ১০০ টাকা হলে খরচ ১২৪ টাকা। এতো গেল জাতীয় ঋণ। আমেরিকার মোট ঋণ এখন ১০৫ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি। প্রতি সেকেন্ডে এই ডলারেরও বেশি। প্রতি সেকেন্ডে এই ঋণ বাড়ছে আগুনের গতিতে। শুধু ছাপাখানা ঘুরলেই কাজ চলে। কারণ ডলার বিশ্বজুড়ে সবারই রিজার্ভ মুদ্রা। অন্য দেশ থেকে পণ্য কিনে আমেরিকা কার্যত কাগজের টুকরো পাঠায়। আর সেই ডলার ধরে রাখতে বাকিরা মাথা খুঁজে পায় না। বাণিজ্য, জ্বালানি, ঋণ সবখানেই তো সেটির দরকার। দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলো হার মানে এই খেলায়। ২০২১ সালে শ্রীলঙ্কায় এ রেশিও ছিল ১১৯ শতাংশ। আমেরিকার চাইতে এই রেশিও কম হলেও ধসে পড়েছিল শ্রীলংকার অর্থনীতি। তারা তো চাইলে ডলার ছাপতে আর পারে না। বিপরীতে আমেরিকা আরো ডলার তৈরি করে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে। আর সেই অতিরিক্ত ডলারের কারণে বিশ্ব বাজারে পণ্যের দাম বাড়ছে। বাকি দেশগুলোর মুদ্রাস্ফীতি যেন ইম্পোর্টেড। আমেরিকা সবচাইতে কোন পণ্য রপ্তানি করে ? এই প্রশ্নের সম্মুখীন হলে অনেকেই বলবে গাড়ি , মোবাইল, টেকনোলজি বা অস্ত্রের কথা। কিন্তু আসলে আমেরিকার সবচাইতে বেশি রপ্তানি করে ঋণ। তাদের দেশের ঋণ রপ্তানি করে দেয় বাইরের দেশে। আর সেই ঋণের বোঝা টানতে হচ্ছে প্রায় সমস্ত দুনিয়াকে। কিন্তু কথা হলো তাহলে ডলার ছেড়ে নতুন ব্যবস্থা আনে না কেন? প্রথম কারণ হচ্ছে পরস্পরের উপর ভরসা কম। নিজের টাকা অন্য কেউ নেবে কীভাবে? দুই আন্তর্জাতিক লেনদেনের সুইফট নেটওয়ার্ক ও বিশ্বব্যাংক আইএমএফ সবই পশ্চিমাদের নিয়ন্ত্রিত। তিন ডলার ঘিরে নিষেধাজ্ঞার ভয়। ইরান বা রাশিয়ার অভিজ্ঞতা দেখলেই আন্দাজ করা যায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া মানে অর্থনীতি বুকে চেপে বসা পাথর। তাই অনেক দেশ মুখে বিকল্পের কথা বললেও পা ফেলতে বুক কাঁপে। যেন কাঁচের ঘরে থাকা ঢিল ছোড়া একসঙ্গে দুটো করা যায় না। তবে পরিবর্তনের চিন্তা একেবারে নেই বললেই ভুল হবে । রাশিয়া ও চীন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রচুর সোনা মজুদ বানাচ্ছে তাদের কোষাগারে যেন আবার কোনোভাবে মুদ্রাকে সোনার মত কঠিন সম্পদের সাথে বাধা যায় উন্নয়নশীল বড় অর্থনীতি নিয়ে ব্রিক্স চোট গঠিত হয়েছে ব্রাজিল রাশিয়া ভারত চীন দক্ষিণ আফ্রিকা মিলে যারা ডলারের বিকল্প আন্তব্যবস্থা খুঁজছে নিজেদের মুদ্রার বাণিজ্য বাড়ানোর কথাও ভাবছে কিছু দেশ কিন্তু ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ প্রতিদ্বন্দীতা আর পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে এসব প্রচেষ্টায় গতি খুব কম। আবার ক্রিপ্টোকারেন্সি উদ্ভাবনের পর অনেকেই আশা করেছিল বিকেন্দ্রিকৃত ডিজিটাল মুদ্রা হয়তো ফিয়ারডের বিকল্প হবে। কিন্তু বিশ্বের বড় সরকারো ও কেন্দ্রিয় ব্যাংকগুলো এটিকেও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে। আমেরিকা প্রচুর অর্থ প্রযুক্তি বিনিয়োগ করে নিজস্ব ডিজিটাল মুদ্রার কাঠামো সিবিডিসি বানাচ্ছে। যাতে ভবিষ্যত ক্রিপ্টো জনপ্রিয় হলেও তারা নিয়ন্ত্রণ হারাবে না। দিনশেষে ক্ষমতাধররা টাকা ও মুদ্রার লাগান ছাড়তে চায় না। সবশেষে বলতে হয় টাকা আসলে এক টুকরো ছাপা কাগজ মূল্য পায় আমাদের বিশ্বাসে আমরা সবাই ধরে নিয়েছি এটি সম্বল এই বিশ্বাসের জোরেই দোকান থেকে চাল কিনে বাসা ভাড়া দিই সঞ্চয় গড়ি অথচ এই বিশ্বাস গেঁথে আছে ঋণ ও ক্ষমতার নরবরে সুতই যত বেশি ঋণ ও নতুন টাকা ছাপা হয় ততবারে মুদ্রাস্ফীতি অসমতা আর অর্থ নৈতিক দোলাচল খবরের শিরোনামে কখনো শ্রীলঙ্কা দেলয়া অবস্থা কখনো ব্যাংক বন্ধ বন্ধ সবই ফিয়ারড় ব্যবস্থার ফাঁকফোটো। সমাধান সহজ নয় তবু সচেতনতা জরুরি। পরিবারের বাজেট তৈরি , সঞ্চয় কিংবা বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত। সবখানে এই জানা কাজে লাগবে। মনে রাখুন টাকা নিজে কিছু নয়। মূল্য দেয় মানুষই। তাই মুদ্রানীতিতে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা না থাকলে বড় ঝড় আসার আশঙ্কা থাকে। ইতিহাস বলে কোন কাগজে মুদ্রায় স্থায়ী হয়নি। একদিন না একদিন পরিবর্তন আসবে। হয়তো ভবিষ্যত আরো ন্যায়সঙ্গত। সেই অনুযায়ী প্রস্ততিও নিতে পারবেন।


No comments