ভারত যেভাবে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে জেনারেল ওসমানীকে থাকতে দেয়নি!
১৬ ই ডিসেম্বর ১৯৭১ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তানি
সেনাবাহিনী আত্মসমপর্ণ করে সেদিন বিকেল ৪.৩১ মিনিটের দিকে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমপর্ণের
দলিলে সই করেন পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চালীয় কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেনেন্ট জেনারেল আমির
আব্দুল্লাহ খান নিয়াজী মিত্রবাহিনীর পক্ষে দলিলে সই করেন লেফটেনেন্ট জেনারেল জগজিত
সিং অররা তবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিল না বাংলাদেশ
সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল মোহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানি, প্রশ্ন থেকে যায় জেনারেল
ওসমানী কী আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে থাকেননি নাকি তাকে থাকতে দেওয়া হয় নি ? নাকি বাংলাদেশের
প্রধান সেনাপতিকে উপস্থিত থাকতে না দিয়ে বাঙালী জাতিকে খাটো করা হয়েছিল ? তার অনুপস্থিতিতে
ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ঠিকই
কিন্তু জনাব খন্দকার সেদিন বসার জন্য কোন চেয়ার পান নেই ঢাকার মাটিতে বিজয়ের ৫৩ বছর
পরও আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ওসমানীর না থাকার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা সমালোচনা আছে অনেক গুজব
কেউ কেউ বলছেন এটা ভারতের ইশারায় হয়েছে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর লিয়াজো অফিসার কর্ণেল
পিএস দাস অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রীকে তার ব্যক্তিগত সচিব ফারুক আজিজ খানের মাধ্যমে
১৬ই ডিসেম্বর বিকেলে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সমর্পণের খবরটি জানান ২০১৩ সালে
গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক সৃতিচারণমূলক নিবন্ধে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান সম্পর্কে একে খন্দকার
বলেছিলেন আমি তখন কলকাতায় ১৬ই ডিসেম্বর সকালের দিকে কিছু কাজে বাইরে গেছিলাম। ফিরলাম
বেলা দশটার দিকে। ফিরে দেখি আমার জন্য কিছু লোক অপেক্ষা করছেন। তাদের কাছেই জানলাম
পাকিস্তানি বাহিনী সেদিন বিকেলে যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করবে। সেজন্য ঢাকার রেসকোর্সে
একটি অনাড়ম্বর অনুষ্ঠান হবে। আর আমাকে সে অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ও মুক্তিবাহিনীর প্রতিনিধিত্ব
করতে হবে। সেই দিন বাংলাদেশকে ওয়াকিবহাল করার অবস্থা যেন দায়শারাভাবে যেদিন আত্মসমর্পণ
সেদিনই বাংলাদেশকে কোনভাবে বিষয়টি জানানো হলো ১৯৭১ সালের ১১ ই এপ্রিল বাংলাদেশ সরকারের
প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এক ভাষণের মাধ্যমে
মোহাম্মদ আতাউল গণি মুক্তিবাহিনী ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে ঘোষণা
দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের অধীনে মুক্তিবাহিনীর সদর দপ্তরে তখন প্রতিরক্ষা
মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন নজরুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পরবর্তীতে
৭১ এর রণাঙ্গন অকথিত কিছু কথা নামে একটি বই লিখেছিলেন তিনি এই বইয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর
আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে কেন জেনারেল ওসমানী ছিলেন না সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা
হয়েছিল বইটির ২৪১ পৃষ্ঠায় নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ
পর্ব শেষ হওয়ার দুদিন পর জেনারেল ওসমানী ক্ষুদ্ধ এবং উত্তপ্ত মুজিবনগর সরকারের সদর
দপ্তরে ফিরে আসেন ঢাকায় পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে তার অনুপস্থিতিকে
কেন্দ্র করে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষোভ এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছিল যা মুজিবনগর সরকারের
জন্য ছিল অস্বস্তিকর ঢাকায় আত্মসং সমর্পণের ক্ষেত্র ভারতের তরফে এমন ভাবে ডিজাইন করা
হয়েছিল যেন বাংলাদেশের সেনাপ্রধান ওসমানীর কাছে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে
না পারে ওসমানী বলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কবে আত্মসমর্পণ করবে তা আমি জানতাম না আমাদেরকে
ওয়াকিবহাল রাখা হয়নি আমি কলকাতা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর তাদের আত্মসমর্পণের কার্যক্রম শুরু
হয়েছিল ওসমানী আরো বলেন আমি দুঃখিত আমাকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে আমাদের মধ্যে আত্মমর্যাদা
বোধের বড় অভাব ঢাকায় ভারতীয় বাহিনী আমার কমান্ডে নয় জেনারেল মানে পক্ষে জেনারেল অরোরার
কমান্ডের অধীনে ঢাকায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করানো হচ্ছে
যৌথ কমান্ডের অধীনে ভারতীয় বাহিনীর কাছে আমি সেখানে অর্থাৎ ঢাকায় যাব কি জেনারেল অরোরার
পাশে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখার জন্য ‘হাউ ক্যান আই’ উনার এই বক্তব্য শুনেই বোঝা যাচ্ছে কৌশলে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের
ভূমিকা করা হয়েছে অথচ সেই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন এবং সার্বভৌম রাষ্ট্র
হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল বলা যায় ১৬ ই ডিসেম্বরের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান ভারতীয় সেনাপ্রধান
এবং সংশ্লিষ্ট মহল এমন ভাবে ডিজাইন করেছিল যেন বাংলাদেশ আজীবন আত্মসমর্পণের দলিলের
দিকে তাকিয়ে আফসোস করে যায় যে ভারতের কাছে পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের ফলেই আমরা বিজয়
পেয়েছি। একই সাথে প্রশ্ন থেকে যায় মুক্তিবাহিনীর পরিবর্তে কেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী
মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল যেখানে ১৬ ই ডিসেম্বর দুপুরে মিত্রবাহিনীর জেনারেল
জ্যাকব কলকাতা থেকে ঢাকা আসতে পারেন সেখানে বাংলাদেশ বাহিনীর প্রধান জেনারেল ওসনামীকে
সিলেট থেকে কেন ঢাকা নিয়ে আসা গেল না দায় সারা ভাবে বাংলাদেশ পক্ষের প্রতিনিধিকে আত্মসমর্পণে
সাক্ষী করা হয়।


No comments