আপনার মোবাইল ফোন কি পুলিশ তল্লাশি করতে পারে, আইন কী বলছে?
ধরুন আপনি রাস্তা দিয়ে হেটে যাচ্ছেন বা কোন গণপরিবহনে
যাচ্ছেন। হঠাত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কেউ আপনার মুঠো ফোনটি চাইল। ফোনটি নিয়ে সেটি
তল্লাশি বা ঘাটাঘাটি শুরু করল। ঢুকে পড়লো আপনার ব্যক্তিগত দুনিয়ায় যেখানে আপনার পারিবারিক
ব্যক্তিগত ছবি এবং ভিডিও সহ অফিশিয়াল নথি সবই সংরক্ষিত থাকে। সাধারণভাবে অধিকাংশ মানুষ
এমন কাজে একদমই স্বাচ্ছন্দবোধ করেন না। কিন্তু বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে
অনেক সময় এই কাজটি করতে দেখা যায়। বাংলাদেশের আইন কী বলছে? আইন কি তল্লাশির অনুমোদন
দেয় ? এইসব নিয়ে চলুন জেনে আসা যাক। পুলিশ নাগরিকদের মুঠোফোন তল্লাশি করছে এইটা বাংলাদেশে
একদমই নতুন কোনো ঘটনা নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এমন ঘটনার অভিযোগ এসেছে একাধিকবার। বিএনপি ২০২২ ও ২০২৩ সালে ঢাকায় সমাবেশ ডাকলে এই অভিযোগ সামনে আসে প্রতিবারই। ২০২৪
এর জুলাই আন্দোলনের সময় এই অভিযোগ আরো প্রকট হয়। কিন্তু এখনো সেই ফোন চেকিং এর অভিযোগ
আবারও সামনে আসছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ধরতে পুলিশ রাজধানীর
বিভিন্ন হোটেল ও মেসে অভিযান চালিয়েছে। একাধিক সংবাদমাধ্যমে বলছে এই সময় পুলিশ বহু
মানুষের মুঠোফোন তল্লাশী করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আইন কী বলছে? বাংলাদেশের কোন
আইনে অভিযোগ বা তল্লাশি সময় মুঠোফোন চেক করে দেখার সরাসরি কোন বিধান নেই। বরং সরকার
সম্প্রতি ব্যক্তিগত উপাত্য সুরক্ষার জন্য একটি অধ্যাদেশ জারি করেছে। সম্প্রতি জারি
হওয়া সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ এর ৩৫ ধারায় যা বলা হয়েছে তা সহজ ভাষাতে বললে বলা
যায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোয় সাইবার হামলা কিংবা কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম
ডিজিটাল ডিভাইস ইত্যাদিতে বেআইনি প্রবেশের মাধ্যমে অপরাধের সম্ভাবনা থাকলে পুলিশ কারণ
লিপিবদ্ধ করে কিছু কাজ করতে পারবেন। যেমন তল্লাশি সময় পাওয়া অপরাধের কাজে ব্যবহার করা
কম্পিউটার , কম্পিউটার সিস্টেম কম্পিউটার নেটওয়ার্ক তথ্য উপাত্য বা অন্যান্য জিনিস
জব্দ করতে পারবেন পুলিশ এবং একই সাথে অপরাধ প্রমাণের সাহায্য করবে এমন কোনো দলিল পেলে
সেটাও জব্দ করতে পারবেন। সাথে ওই স্থানে উপস্থিত যেকোনো ব্যক্তির দেহ তল্লাশি ও অপরাধী
সন্দেহ হলে গ্রেপ্তার করতে পারবেন। কিন্তু তল্লাশির প্রতিবেদন দ্রুত ট্রাইবুনালে দাখিল
করতে হবে। এবার আমরা যদি ২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৮০ ধারার দিকে
তাকাই তাহলে সেখানে যা বলা হয়েছে তা সহজ ভাষায় বললে এই আইন কোন অনুসন্ধান বা তদন্তের
যদি প্রয়োজন হয় তাহলে পুলিশ কর্মকর্তা কিছু পদক্ষেপ নিতে পারবেন। যেমন, পুলিশ লিখিত
দিয়ে ওই স্থানে তল্লাশি করতে পারবেন। এছাড়া সংশ্লিষ্ট যেকোনো বস্তু আটক করতে পারবেন
এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে পারবেন। আমরা যদি আরেকটু গভীরভাবে দেখি তাহলে এই দুইটি আইনের
একটি শব্দ আছে সেটি হল লিখিত। অর্থাৎ পুলিশকে লিখিত দিতে হবে ডিভাইস তল্লাশীর আগে।
সুপ্রিয় কোর্টের আইনজীবী স্নেহাদী চক্রবর্তী প্রথম আলোকে বলেছেন, গণহারে মুঠোফোন তল্লাশি
করার আইনগত কোন সুযোগ নেই। কারণ সংবিধান তা অনুমোদন দেয় না। তিনি প্রথম আলোকে আরো বলেন,
সুনির্দিষ্ট কোন অপরাধের তদন্তের স্বার্থে যুক্তিসংত আইনানুক প্রয়োজনে ডিজিটাল ডিভাইস
চেক করা যেতে পারে। কিন্তু তার সুযোগও সীমিত। ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার সংবিধান
দ্বারা স্বীকৃত। মুঠোফোন মানুষের আয়রোজগার থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার হয়।
কোন ওয়ারেন্ট ছাড়া আদালতের অনুমতি ছাড়া এভাবে গণহারে মুঠোফোন চেক করা মানুষের গোপনীয়তার
অধিকার চলাচলের অধিকারকে ক্ষুন্ন করে। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময়
বড়ুয়া ২০২২ সালে বিবিসি বাংলাকে বলেন, মোবাইল ফোন পুরোপুরি একজনের ব্যক্তিগত একটি যন্ত্র। আদালতের আদেশ ছাড়া কোনভাবেই সেটি সার্চ করার এখতিয়ার কারো নেই। কারণ, এই ব্যক্তিগত
গোপনীয়তার অধিকার তাকে বাংলাদেশের সংবিধানে দেয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন, তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের
ক্ষেত্রে বহুদিন যাবত ব্রিটিশ আমলের আইন অনুসরণ করা হলেও ২০০৩ সালে হাইকোর্ট বিনা পরোয়ানায়
৫৪ ও ১৬৭ ধারায় গ্রেফতার ও রিমান্ডের ক্ষেত্রে ১৫ টি নির্দেশনা জারি করেন। পরবর্তীতে
২০১৬ সালের এপ্রিলে কিছু সংশোধন সাপেক্ষে সুপ্রিম কোর্ট সেই আদেশ বহাল রাখেন। সেখানে
বলা হয়েছে কোন পুলিশ কর্মকর্তা সন্দেহের বসে কাউকে তল্লাশী করা দরকার মনে করলে সেটা
ডায়রিতে লিপিবদ্ধ করে সাক্ষীর উপস্থিতিতে তা করবেন। কিন্তু সেটা শুধুমাত্র দেহ তল্লাশীর
ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।


No comments