আলকাট্রাজ জেল রহস্য : আমেরিকার ইতিহাসে সেরা প্রিজন ব্রেক
সান ফ্রান্সিসকো উপসাগরের ঠিক মাঝখানে ছোট একটা দ্বীপ।
সবুজ গাছ পালার বদলে ধূসর পাথর আর বিষণ্য নীরাবতায় ঘেরা এই দ্বীপের নাম আলকাট্রাস।
দূর থেকে দেখলে মনে হবে শান্ত নিরিবিলি এক দ্বীপ কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই
দ্বীপের প্রতিটি পাথরের সাথে গেথে আছে ভয়, রহস্য আর ইতিহাসের চাপা আর্তনাদ। ২০ শতাব্দীতে
দ্বীপ টা ছিলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে দূর্ভেদ্য আর ভয়ংকর এক কারাগার। এই কারাগারকে সবাই ডাকে রক নামে। চারপাশ ঘেরা উত্তাল
সমুদ্র, হিমশীতল পানি আর নিছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা মিলিয়ে এই জেলটা ছিলো এক প্রকার
মৃত্যু ফাদ। ১৯০৯ সালে প্রথম এইখানে জেলখানা তৈরি করা হলেও ১৯৩৪ সালে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা
ব্যবস্থা নিয়ে শুরু হয় এর নতুন এক অধ্যায়।
উদ্দেশ্য ছিল একটাই, এমন ভয়ংকর আর কঠিন জায়গা তৈরি করা যেখানে বন্দিরা ঢুকলে
আর কোনোদিন পালানোর কথা স্বপ্নেও ভাববে না। এই কারাগারে কুখ্যাত সব বন্দীরা থাকতো যাদের
নাম শুনলেই গা শিউরে উঠত। এখানেই একসময় বন্দি
ছিলেন ভয়ংকর মাফিয়া লিডার আলকাপনে। ছিলেন সিরিয়াল কিলার বার্ডম্যান, রবার্ট স্ট্রাউড, মেশিনগান ক্যালির মতো ভয়ংকর সব
অপরাধী। বলা হয় এখান থেকে পালানোর চিন্তা করাটাই
ছিল বোকামি। খরচ বাচাতে ১৯৬৩ সালে কারাগারটি
স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই কারাগার
পুনরায় চালু ও সম্প্রসারণের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি সেই সাথে দাবি করেন আলকাট্রাস থেকে
কেউ কোনোদিন পালাতে পারেনি। কিন্তু আসলেই কী তাই?
ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। আলকাট্রাজের নামের সাথে জড়িয়ে
আছে এক দুর্ধর্ষ প্রিজন ব্রেকের ঘটনা। সময়টা
১৯৬২ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে বহু
আগেই কিন্তু মার্কিন সমাজ তখনো অস্থির। অর্থনৈতিক
মন্দা আর রাজনৈতিক অস্থিরতার সু্যোগে শহরের রাস্তায় তখন প্রতিদিনই নতুন নতুন অপরাধের
জন্ম হচ্ছে। অস্ত্র, মাদক আর ব্যাংক ডাকাতি তখন নিত্যদিনের ঘটনা। সেই সময়ই ডাকাতি করতে
গিয়ে জেলে যায় জর্জিয়ার এক কৃষক পরিবারের দুই ভাই। জন এয়ংলিং এবং ক্লারেন্স এয়ংলিং।
তারা বার বার জেল পালানোর চেষ্টা করার প্রায় শেষ পর্যন্ত তাদের আলকাট্রাজে নিয়ে আসা
হয়। এই দ্বীপে এসে দুইভাইয়ের পরিচয় হয় ফ্রাংক লি মরিস নামের আরেক কুখ্যাত বন্দীর সাথে। ফ্রাংক মরিসের জীবন ছিল সিনেমার গল্পের মতোই রোমাঞ্চকর।
ছোট বেলায় বাবা- মা মারা যাওয়ার পর পালক পরিবারের কাছ থেকে পালিয়ে তিনি পা রাখেন অপরাধের
জগতে। অত্যন্ত বুদ্ধিমান ঠান্ডা মাথার মরিস জেল থেকে পালানোর জন্য কুখ্যাত ছিলেন। আলকাট্রাজে
আসার পর তিনি আবারো শুরু করেন এক অসম্ভব কাজের পরিকল্পনা। এই দূর্ভেদ্য জেল থেকে পালানোর
পথ খোঁজা। ফ্রাংকের পরিকল্পনায় যুক্ত হয় এংলিং
ব্রাদার্স। আরেক বন্দি এলেন ওয়েস্টও যোগ দেন তাদের সাথে। রাতের অন্ধকারে কারারক্ষীদের
চোখে ধুলো দিয়ে তারা চামচ দিয়ে একটু একটু করে সেলের ভেন্টিলেটরের মুখ খুলতে থাকেন।
কাজটা কিন্তু মোটেই সহজ ছিল না। প্রতিদিন কয়েক
ঘন্টা ধরে চলতে থাকে এই চেষ্টা। শব্দ যাতে
বাইরে না যায় সেজন্য নানা ভাবে শব্দ আড়াল করার চেষ্টাইও ব্যস্ত থাকতেন তারা। প্রায়
৬ মাস ধরে চলতে থাকে এই গোপন কাজ। পালানোর
আগেই তাদের তৈরি করতে হয়েছিল নকল মাথা। টয়লেট টিস্যু আর পুরনো পেপারস এবং সাথে কারাগারের
সেলুন থেকে পাওয়া চুল দিয়ে এমন নিখুঁত মাথা বানিয়েছিলেন তারা। যা দেখলে আসল মানুষ ভেবে ভুল হতে পারে। ১৯৬২ সালের ১১ জুন রাত। পরিকল্পনার সবটাই এগোচ্ছিলো নিখুঁতভাবে। কিন্তু বিপত্তি বাধলো ওয়েস্টকে নিয়ে। স্বাস্থ্য
একটু বেশি ভালো হওয়ায় ভেন্টের মুখ দিয়ে বের হওয়ার সময় তিনি আটকে যান। অনেক চেষ্টা করেও
যখন বের হতে পারলেন না তখন তিনি নিজেই সিদ্ধান্ত নিলেন পিছিয়ে যাওয়ার। গভীর রাতে সবাই
যখন ঘুমিয়ে ফ্রাংক মরিস আর দুই ভাই জন এবং ক্লারেন্স স্যাংলিন ভেন্টিলেটর এর ছোট গর্ত
দিয়ে পৌছে যায় কারাগারের ছাদে। তারপর তারা পাইপ বেয়ে নেমে আসেন নিচে। কারাগারের উচু
দেয়াল পার হয়ে তারা নেমে যায় সমুদ্রের তীরে। ৫০ টিরও বেশি রেইনকোট একত্রিত করে তারা তৈরি করেছিল ভেলা। যা দিয়ে শুরু হয় উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দেয়ার অসম্ভব
এক অভিযান। পরদিন সকালে যখন কারাগারের রুটিন
পরিদর্শনে কারারক্ষীরা আসেন তখন চমকে যান তারা।
তিনটি সেলে বন্দিরা তখনও ঘুমাচ্ছেন। এমন দৃশ্য দেখে সন্দেহ দানা বাধে। লাঠি
দিয়ে মাথায় খোচা দিলেই বেরিয়ে আসে আসল রহস্য। সাথে সাথে কারাগার জুড়ে সাইরেনের শব্দ।
শুরু হয় ব্যাপক তল্লাশি। কিন্তু ততক্ষণে অনেক
দেরি হয়ে গেছে। তিনজন বন্দি একদম নিখোঁজ। এ ঘটনার তদন্ত চালায় এফবিআই। টানা
১৭ বছর ধরে তদন্ত করেও তারা বের করতে পারেন নি তিন বন্দির শেষ পরিণতি কি হয়েছিল। অবশেষে ১৯৭৯ সালে তদন্ত বন্ধ করে ঘোষণা করা হয় তারা
সম্ভবত সমুদ্রের পানিতে ডুবে মারা গিয়েছে।
কিন্ত আজও অনেকে বিশ্বাস করেন ওইতিজন আসলে সফল ভাবে পালাতে সক্ষম হয়েছিলেন।
বলা হয় ওই রাতে তারা কাছের কোনো দ্বীপে পৌছে গাড়ি চুরি করে গা ঢাকা দেন। এই কেলেঙ্কারীর এক বছর পরই অতিরিক্ত খরচের কারণে
আলকাট্রাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু আজও দ্বীপটা
দাঁড়িয়ে আছে রহস্যের সাক্ষী হয়ে। প্রতিবছর
অসংখ্য দর্শনার্থীরা দ্বীপটিতে ভ্রমণে যায়। একবারের জন্য হলেও যেন এই জেল ভেঙে পালানোর
গল্প সত্যিই প্রমাণ করে। বাস্তবতা কখনো কল্পনার চেয়েও বেশি রোমাঞ্চকর আর রহস্যময় হতে
পারে। সেই রহস্যের উত্তর হয়তো সমুদ্রের নীল গভীরতায় চাপা পড়ে আছে অথবা হয়তো পৃপৃথিবীর
কোনো প্রান্তে সাবেক তিন বন্দির বিজয়ের হাসির মধ্যে বেচে আছে।


No comments