কানাডা কেন বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে ?
উন্নত জীবন যাপনের কথা বললেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে
ইউরোপ আমেরিকার কথা। বিশেষ করে আমরা মনে করি যেসব দেশে যেতে পারলে ভাগ্য রাতারাতি
আমুল বদলে যাবে এমন একটি শীর্ষ দেশ হলো কানাডা। কিন্তু বাস্তবতা হলো বহু আরাধ্য কানাডার
মতো দেশের স্থানীয় নাগরিকরাও এখন নানা সংকটে হাঁপিয়ে উঠেছে। জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়, সরকারি ট্যাক্সের বোঝা, সাংস্কৃতিক পরিচয়হীনতা, জলবায়ু জনিত সমস্যা, অভিভাষণ সংকট
এবং বেকারত্বের মতো হাজারো সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে কানাডা। সব কিছু মিলিয়ে উত্তর
আমেরিকার স্বপ্নের দেশ কানাডা বসবাসের জন্য অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে কেন সে সম্পর্কে জানবো
আজকে। উত্তর আমেরিকার অন্যতম উন্নত দেশ হয়েও কানাডার জীবনযাত্রার খরচ এখন এমন পর্যায়ে
পৌঁছেছে যা দেশটির অনেক ধনী মানুষের কাছেও অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। কানাডার বেশিরভাগ
খাদ্য পণ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসে। তবু কানাডার দোকানপাটে সেই একই নিত্যপণ্যের দাম
আমেরিকার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি । ফলে দৈনন্দিন বাজার করায় অনেক পরিবারের জন্য বাড়তি
চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিত্যপণ্যের চেয়েও বড় সংকট হয়ে দেখা দিচ্ছে আবাসন বাজারে। বর্তমানে
একটি সাধারণ বাড়ি কিনতে গেলে তাদের বার্ষিক আয়ের প্রায় ১৩ গুণ বেশি অর্থ খরচ করতে হয়।
অথচ মাত্র এক প্রজন্ম আগেও এই ধরণের বাড়ির দাম ছিল তাদের বার্ষিক আয়ের মাত্র চার গুণ। টরেন্টো ও ভ্যাংকুভারের মতো বড় শহরের বাইরে গেলেও বাড়ির দাম সাধারণত ১ মিলিয়ন ডলার
থেকে শুরু হয়। এমনকি নিউইয়র্ক সিটির মতো ব্যয়বহুল শহরের তুলনায়ও কানাডার আবাসন খরচ
এখন প্রায় দ্বিগুণ। এই পরিস্থিতিতে কানাডার মানুষের কাছে বাড়ি কেনা স্বপ্ন নয় বরং
এক ধরণের আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। কারণ, আবাসন ব্যয়ের পাশাপাশি নানার ধরণের ট্যাক্স বাড়ির
মালিকদের আর্থিক চাপ আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। বর্তমানে কানাডায় একজন সাধারণ নাগরিক তার
উপার্জনের প্রায় অর্ধেক টাকাই কর হিসেবে দিতে বাধ্য হয়। আয়কর থেকে শুরু করে বিক্রয়কর,
সম্পত্তি কর, বেতনের কাটতি সব মিলিয়ে প্রায়
৫০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ সরকারি ট্যাক্স বাবদ কেটে রাখা হয়। ছোট ব্যবসার মালিক ও উদ্যোক্তাদের
ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি আরো কঠিন। কারণ ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে আরো বিভিন্ন অতিরিক্ত
চার্জ ও কর যুক্ত হয়। যার ফলে উদ্যোক্তাদের প্রকৃত করের হার সাধারণ মানুষের তুলনায়
আরো বেশি । এত বিপুল পরিমাণ কর দেওয়ার পরও নাগরিকরা যে মানের সরকারি পরিসেবা প্রত্যাশা
করে বাস্তবে সেই চাহিদার খুব কমই পূরণ করতে পারছে কানাডার সরকার । অর্থনীতি ও শ্রমবাজার
সচল রাখতে কানাডা প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ অভিবাষী গ্রহণ করে। কিন্তু তার বিপরীতে স্বাস্থ্য
সেবা চিকিৎসা অবকাঠামো এবং মৌলিক সরকারি পরিষেবা সেই হারে বাড়ছে না। নতুন হাসপাতাল
তৈরি হচ্ছে না বললেই চলে। সেই সাথে ডাক্তারেরও ব্যাপক সংকট রয়েছে। এমনকি হাসপাতালের
জরুরি বিভাগেও রোগীদের কে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতে হয়। এভাবেই একদিকে মানুষ বিপুল
কর দিচ্ছে অন্যদিকে প্রয়োজনীয় সেবাও পাচ্ছে না। নাগরিকদের অভিযোগ হলো সরকার ট্যাক্স
সংগ্রহের ব্যাপারে যতটা কঠোর সেবা প্রদানের বেলায় ততটাই উদাসীন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে
কানাডায় ওয়েক কালচার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। অন্তর্ভুক্তি, বৈচিত্র্য ও মানবাধিকারের
নামে তারা ব্যাপক আকারে সমকামিতার প্রচারণা চালাচ্ছে। অফিস, আদালত, ব্যাংক এমনকি সরকারি
ভবনের বাইরে বড় বড় সমকামী পতাকা, সমকামিতার রংধনু রঙ কিংবা নানা যৌনোতার বার্তা ফলাও
করে প্রচার করা হচ্ছে। স্থানীয় পুরনো কানাডিয়ান নাগরিকদের অনেকের কাছেই এগুলো সমকামিতার
প্রতি সমর্থনের চেয়ে বরং সাধারণ মানুষের উপর সমকামিতার ভূত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা বলে
মনে হচ্ছে। অনেকেরই অভিযোগ হলো ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও মুল্যবোধের দোহাই দিয়ে সামাজিকভাবে
এসব যৌনতার বার্তা এমন মাত্রায় পৌছেছে যে তা সাধারণ নাগরিকদের স্বাভাবিক সামাজিক পরিসরকে
প্রভাবিত করছে এবং নতুন প্রজন্মের শিশুদের লালন-পালন করা নিয়ে পিতা-মাতারা মারাত্মক
সমস্যার মধ্যে পড়েছে। কারণ, স্কুল – কলেজের সচেতনতা তৈরির নামে বাচ্চাদের রীতিমত সমকামী
হওয়ার জন্য ব্রেইন ওয়াস করা হচ্ছে। কানাডা বহু সংস্কৃতির দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও দেশটির
মূলত কোনো একক সংস্কৃতিই নেই। থাইল্যান্ড বা জাপানের মত দেশগুলোর যেমন স্পষ্ট পরিচয়
আছে তাদের খাদ্য, ভাষা, পোশাক, উৎসব প্রথা সবকিছু মিলিয়ে একটি জাতির সামগ্রিক পরিচয়কে
দৃঢ়ভাবে ধারণ করে কিন্তু কানাডায় সেই ধরণের একীভূত পরিচয় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। অসংখ্য
সংস্কৃতির মিলনস্থান হওয়া সত্ত্বেও কানাডার জাতীয় জীবন যেন একটি সুস্পষ্ট ভিত্তি হারিয়ে
ফেলেছে। ফলে এখানে জণ্মানো বা নতুনভাবে আগত অনেকের মনেই একধরণের বিচ্ছিন্নতা, শিখরহীনতা
এবং অভ্যন্তরীণ সামাজিক দুরত্ব তৈরি হচ্ছে। কানাডায় নতুন প্রজন্ম বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন
চাকরির বাজারের জন্য প্রতিযোগিতা করছে। বর্তমানে কানাডার ২৫ বছরের কম বয়সী স্নাতকদের
বেকারত্বের হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিগ্রি শেষ করার পরও বহু
তরুণ মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর ধরে স্থায়ী চাকরি খুঁজে পায় না। যারা চাকরি পায়
তারাও প্রায়ই অতিরিক্ত সময়ে কাজ করে কম বেতনে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। ফলে অনেকেই দিনের
বেলা মূল চাকরির পাশাপাশি রাতের বেলা আবার রেস্তোরা, গোদাম, কিংবা ডেলিভারির মতো অতিরিক্ত
কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানিরা বলছেন চাকরির অনিশ্চয়তা এবং উচ্চ ব্যয়ের চাপে
তরুণরা ক্রমশ তিক্ত, মানসিক ভাবে ক্লান্ত এবং উত্তেজিত হয়ে উঠছে। কানাডার তথাকথিত
উন্নত দেশে আর্থিক স্বাধীনতার বদলে টিকে থাকাটাই এখন প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুধু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা স্নাতকরাই নয় বিশেষজ্ঞ পেশাজীবীদের ক্ষেত্রেও আরো
বড় সংকট তৈরি হয়েছে ডাক্তার, প্রকৌশলী প্রযুক্তিবিদদের মতো বহু দক্ষ কর্মী নিজেদের
পেশাগত ক্ষেত্রে চাকরি না পেয়ে দুই থেকে তিন বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বাধ্য হচ্ছেন।
নিয়মকানুন, লাইসেন্সিং এবং অভিজ্ঞতার স্বীকৃতির জটিল প্রক্রিয়া তাদের ক্যারিয়ারকে আটকে
দিচ্ছে। ফলে, অনেকে উচ্চশিক্ষিত হয়েও শুধুমাত্র বেঁচে থাকার তাগিদে খুচরা দোকান, ডেলিভারি,
ফাস্টফুড কিংবা গোদামের কাজে যোগ দিতে বাধ্য হচ্ছে। কানাডা বহু দশক ধরে অভিবাসীদের
জন্য সবচেয়ে সহজ এবং অতিথীয়তাপূর্ণ গন্তব্য হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে
সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ, আবাসন সংকট এবং অপর্যাপ্ত
অবকাঠামোকে সামনে রেখে কানাডার সরকার অভিভাসণ নীতি আরো কঠোর করেছে। এর ফলে কানাডার
ওপেনডোর নীতির জায়গায় এখন আসছে নিয়ন্ত্রিত এবং সীমিত অভিভাষণ কাঠামো। একসময় কানাডীয়
বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ছিল দেশের শিক্ষা এবং অর্থনীতির অন্যতম
বড় চালিকাশক্তি। কিন্তু কানাডায় পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীরা এখন সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায়
মুখে রয়েছে। বহু শিক্ষার্থী কানাডায় পড়তে আসার জন্য নিজেদের সমস্ত সঞ্চয় ব্যয় করেছে।
কেউ ঋণ নিয়েছে কেউ বা আবার জমি জমা বা সমস্ত সম্পত্তি বিক্রি করে এখানে এসেছে। অথচ
পিআর বা স্থায়ী বসবাসের নিয়ম পরিবর্তন হওয়ার কারনে তাদের অনেকেরই ভবিষ্যত ঝুকিতে আছে।
দেশটির আবাসন সংকটও সরাসরি অভিবাসীদের জীবনযাত্রায় আঘাত হেনেছে। বড় শহর গুলোতে বাসা
ভাড়া এমন বেড়েছে যে দুই বেডরুমের ছোট এপার্টমেন্টে আটজন মানুষ গাদাগাদি করে থাকা শেয়ার্ড
বেজমেন্ট, জানালাবিহীন ঘর কিংবা গোদামের মতো অস্বাস্থ্যকর আবাসনেও উচ্চ ভাড়া দিয়ে
থাকতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে।শুধু তাই নয় অভিবাসীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমাজে বর্ণবাদ,
পক্ষপাত এবং জেনোফোবিক আচরণও চোখে পড়ার মতো বেড়েছে বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া ও ভারতীয়
সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অনলাইনে বিদ্বেষমূলক প্রচার এবং বর্ণবাদী আচরণ অনেক বেড়ে গেছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিবাসীদের দোষারোপ করে নানান ধরণের প্রচারণা দেখা যাচ্ছে।
যা নতুন অভিভাষীদের জন্য এক ধরণের সামাজিক অস্বস্তি এবং নীরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে।
কানাডার শীত বিশ্বের কঠিনতম শীতগুলোর একটি। বছরের দীর্ঘ সময় জুড়ে দেশটি বরফে ঢাকা থাকে। অন্যদিকে উষ্ণ বা রোদেলা দিনের সংখ্যা এতটাই কম যে সাধারণ মানুষের কাছে তা বিরল সুখের
মত মনে হয়। তাপমাত্রা কখনো কখনো হিমাঙ্গকের অনেক নিচে নেমে যায়। ফলে ঘরের বাইরে প্রতিটি
কাজই কষ্টকর হয়ে ওঠে। অতিরিক্ত শীতের কারণে দেশটির সামাজিক জীবনও বেশ সংকুচিত হয়ে যায়।
ফলে বাংলাদেশ , ভারত বা পাকিস্তানের মতো অধিক সামাজিক বন্ধনের দেশ থেকে যারা যায় তাদের
কাছে কানাডার শীতকাল অনেকটা জমাট বাধা বরফের নরকের মতো মনে হয়। কানাডার বড় শহরগুলোতে
জানজট আরেকটি স্থায়ী দুর্ভোগ। ভ্যাংকুভার বা টরেন্টো এখন উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে জ্যাম
প্রবণ শহরগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। জ্যামের কারণে ৩০ মিনিটের রাস্তা পার হতে প্রায় দুই
ঘন্টা পর্যন্ত সময় লাগে। এইসব সমস্যার সম্মিলিত প্রভাব কানাডার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন
জীবনে গভীর সংকট তৈরি করেছে। অনেকেই মনে করেন উচ্চ কর, উচ্চ ব্যয় এবং বেশ কিছু সামাজিক
সংকটের কারণে কানাডা এখন আর সেই স্বপ্নের দেশ নেই ।


No comments