নির্বাচনের আগে ' আন্ডারওয়াল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তৎপরতা কী বার্তা দিচ্ছে?
১০ নভেম্বর দুপুরবেলা ঢাকার ব্যস্ততম আদালত এলাকা হঠাৎ
দুজন মুখোশ পরিহিত অস্ত্রধারী তাড়া করে বসেন একজনকে। এরপর দিনে দুপুরে প্রকাশ্যে কয়েক
রাউন্ড গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় সেই ব্যক্তিটিকে। কিংবা আপনি একটু ফিরে যান ৫ দিন
আগে ৫ নভেম্বর দেশের আরেক প্রান্ত চট্রগ্রামে একই কায়দায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা
করা হয় অন্য এক ব্যক্তিকে। পুলিশ পরবর্তীতে জানায় ঢাকায় খুন হওয়া ব্যক্তিটি ছিলেন শীর্ষ
সন্ত্রাসী মামুন আর চট্রগ্রামে খুন হওয়া ব্যক্তি অপরাধ জগতের আরেক সদস্য সারওয়ার হোসেন
বাবলা। পুলিশের ভাষ্য তাদের হত্যা করা হয়েছে আন্ডারওয়ার্ল্ডএর আধিপত্যের বিস্তারকে
কেন্দ্র করে। সামনে জাতীয় নির্বাচন আর এর মাঝে এই আন্ডারওয়াল্ডের অস্থিরতা নিয়ে এখন
জণমনে আছে উদবেগ, অস্থিরতা। হঠাৎ কীভাবে সক্রিয় এই আন্ডারওয়াল্ড? আইন- শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে
কী আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে তা জানবো আজকে।
বাংলাদেশের আন্ডারওয়ার্ল্ড এর ইতিহাস কিন্তু বেশ পুরনো
৮০-৯০ দশকে আন্ডারওয়াল্ড কিন্ত বেশ সক্রিয়ই ছিল। নিয়মিতই পত্রিকায় শিরোনাম আসত কিন্তু
গতকয়েক বছরে এই আন্ডারওয়ার্ল্ডকে আগের তুলনায় বেশ নিস্ক্রিয় থাকতে দেখা গেছে। কিন্তু,
২০২৪ এ ৫ আগস্টের পরবর্তী সময় পাল্টাতে থাকে পরিস্থিতি। আওয়ামীলীগ সরকার পতনের পর কারাগার
থেকে মুক্তি পান আব্বাস আলি ওরফে কিলার আব্বাস, সুইডেন আসলাম, ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে
পিচ্চি হেলাল, বিদেশ থেকে দেশে ফেরেন মোল্লা মাসুদ ও টোকাই সাগর। ফিরে তারা নিজ নিজ
এলাকা আবার দখলে ব্যস্ত হয়েছেন। আগের অনুসারীদের
ডেকে পাঠানো এবং চাদাও দাবি করা শুরু করেছে সেই সব কাজকর্মে স্থানীয় ক্যাডার এতে বাধা
দিলে সংঘাত বেধে যাচ্ছে তাদের মধ্যে। যেমনটা বলছেন, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ডিবি
প্রধান শফিকুল ইসলাম, তিনি জানান শীর্ষ সন্ত্রাসী মামুন খুন হয়েছেন আরেক সন্ত্রাসী
বাহিনীর ইমন গ্রুপের ইমনের সাথে আধিপত্য বিস্তার ও দন্দের জেরে। অভিযোগ আছে, ইমনের
সহযোগি রনি এই হত্যাকান্ডের নির্দেশ দেয় এবং দুইজন বন্দুক ধারীকে দুই লক্ষ টাকা দেওয়া
হয়।
ঢাকার কোন এলাকা কার নিয়ন্ত্রণে?
ঢাকার এলাকাগুলো এই আন্ডারওয়ার্ল্ড এর শীর্ষ সন্ত্রাসীরা
নিজেদের মতো করে ভাগ করে নিয়েছেন। এক একজনের নিয়ন্ত্রণে আছে ভিন্ন ভিন্ন এলাকা আবার
কেউ বিদেশে বসে নিয়ন্ত্রণ করছে কিছু নিদিষ্ট এলাকা। ঢাকার পাইকপাড়া, কল্যাণপুর, আদাবর ও মোহাম্মদপুরের
কিছু অংশে পিচ্চি হেলালের গ্রুপ ঠিকাদারদের কাছে চাদা তোলে। জিসান গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে
আছে মালিবাগ, মতিঝিল, মগবাজার, বাড্ডা ও মহাখালীর
মতো এলাকা। বিদেশে বসে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন নিয়ন্ত্রণ করে মোহাম্মদপুর, ধানমণ্ডি, ঝিগাতলা,
হাজারিবাগ ও নিউমার্কেটের কিছু অংশ আবার তার মূল সহযোগি রনি, কাল্লু ও শহিদুল বেড়াইখালি
থেকে রায়ের বাজার পর্যন্ত চাদা তোলে। বিদেশে থাকা আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহদাতের হয়ে
তার সহযোগীরা নিয়ন্ত্রণ করে মিরপুর -১, ও শাহ আলিতে স্থানীয় ব্যবসা, ঠিকাদারি ও পণ্য
ব্যবস্থাপণা। মিরপুর ১০, ১৩, ১৪ ইব্রাহিমপুর, কচুখেত ও ভাসানটেকের নিয়ন্ত্রণ কিলার
আব্বাস ও ইব্রাহিমের সাথে যুক্ত দলের হাতে। তবে ঢাকা থেকে একটু আমরা নজর ফেরায় চট্রগ্রামের
দিকে, পালাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ বিদেশে বসে নিয়ন্ত্রণ করছে চট্রগ্রামের
অপরাধ জগৎ। সম্প্রতি, নির্বাচনি প্রচারণা চালানোর সময় সারাওয়ার বাবলাকে গুলি করে হত্যা
করা হয়েছিল এবং সেই সঙ্গে ২৩ শে মে পতেঙ্গায় আকবরকে হত্যা করা হয়। এই সারওয়ার এবং আকবর
এক সময় ছিল সাজ্জাদের সসহযোগী। পুলিশ জানাচ্ছে, দুটি হত্যা কান্ডই হয়েছে সাজ্জাদের
আদেশে এবং তাদের সূত্র মতে গত ১ বছরে তার গ্রুপ জড়িত ছিল ১০ টি খুনের সাথে। সারওয়ার
হত্যাকাণ্ড ছাড়াও গতমাসে চট্রগ্রামের রাউজানে আধিপত্য বিস্তারের দন্দে স্থানীয় ব্যবসায়ী
আব্দুল হাকিম ও যুবদল কর্মী মোহাম্মদ আলমগীরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আন্ডারওয়াল্ডের
সব হত্যাকান্ডে ব্যবহিত হচ্ছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। পুলিশ সদর দপ্তরে জমা দেওয়া এক গোয়েন্দা
রিপোর্ট বলছে কমপক্ষে ১৮টি সিমান্ত পয়েন্ট দিয়ে নিয়মিত অবৌধ্য অস্ত্র দেশে ঢুকছে, সবচেয়ে টেকনাফ, বেনাপোল, চাপাইনবয়াবগঞ্জ, কুষ্টিয়া,
দিনাজপুর ও মেহেরপুর। আবার আরেকটা সুত্র বলছে, দেশের বিভিন্ন এলাকাতে রাইফেল ও সাব-মেশিনগানের
মতো আগ্নেয়াস্ত্র ছড়িয়ে পড়েছে।
আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাষ্য তাহলে কী?
পুলিশ সদর দপ্তর সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে
সতর্ক করে বলেছে নির্বাচনের সময় ভোটারদের ভয় দেখানো, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রচারণায় হামলা
এবং ফলাফলকে প্রভাবিত করতে অপরাধী চক্রগুলোকে ভাড়াটে পেশিশক্তি হিসেবে ব্যবহার করা
হতে পারে, তাদের রিপোর্ট অনুযায়ী, আরও বলা হয়েছে, রাজনৈতিক কুশিলবরা তাদেরকে ব্যবহার
করছে। আবার, ১ আগস্ট থেকে ৯ নভেম্বরের মধ্যে র্যাব ১৮৯টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার এবং
৯৮ জনকে গ্রেফতার করেছে। বিজিবি জানাচ্ছে, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে সিমান্ত থেকে ১২২৫
টি আগ্নেয়াস্ত্র ও বিপুল পরিমাণে গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। অপরদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের
সময় থানা থেকে লুট হওয়া ১৩০০ টিরও বেশি আগ্নেয়াস্ত্র এখনো নিখোঁজ। আর এর অনেকগুলোই এখন অপরাধীদের হাতে এবং সারাদেশে
অপরাধ কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে জানা গেছে। কিন্তু, ডিএমপি কমিশনার শেখ মোহাম্মদ
সাজ্জাদ আলী জানায়, ঢাকার অপরাধ পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আছে। আগের মাসগুলোর তুলনায়
ছিনতাই ও দিনেদুপুরে হামলার ঘটনাগুলো উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে। কিন্তু, পুলিশের এইসব
অপরাধীদের নজরদারিতে রাখার কথা বললেও তারা ঠিক ই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থেকে
অপরাধের সাথে লিপ্ত


No comments