Header Ads

অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়া কতটা বিপদজনক?

অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়া কতটা বিপদজনক, ঢাকা ভয়েস, Dhaka Voice, Trending News, Viral News, Top News, bangla news, bangladeshi news, today update news,

পৃথিবীর নানা প্রান্তে লাখ লাখ মানুষ যুদ্ধ, দারিদ্র্যত, বেকারত্ব, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জলবায়ু পরিবর্তন এর মতো নানা কারণে নিজের দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। তবে সবার পক্ষে বৈধ কাগজপত্র নিয়ে যাত্রা করাটা সম্ভব হয় না। তখন তারা ঝুঁকিপূর্ণ অবৈধ পথে পা বাড়ায়। বিশ্বব্যাপী অভিবাসন প্রত্যাশীদের সবচেয়ে কাংখিত গন্তব্য হলো ইউরোপ। আর অবৈধ উপায়ে ইউরোপে যাওয়ার জনপ্রিয় পথ হল ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম এর তথ্য মতে গত এক দশকে শুধুমাত্র ভূমধ্যসাগরেই প্রায় ২৯ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। অথচ এরা সবাই এসেছিল একটি নিরাপদ আর সম্মানজনক জীবনের আশায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত পর্যবেক্ষণ সংস্থা ফ্রন্টেক্স এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবৈধভাবে সমুদ্রপথে ইউরোপ প্রবেশের তালিকায় বাংলাদেশীরা রয়েছে শীর্ষে। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়া কতটা বিপদজনক সে সম্পর্কে জানবো আজকের ভিডিওতে।

ভূমধ্যসাগরের একদিকে রয়েছে আফ্রিকা মহাদেশ এবং অন্যদিকে ইউরোপ। আফ্রিকার দেশ মরক্কো, তিউনিশিয়া, লিবিয়া ইউরোপের ঠিক দক্ষিণে ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত। ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী এসব দেশের উপকূল থেকে ইউরোপের দূরত্ব খুব বেশি নয়। লিবিয়া থেকে ইতালির ল্যাম্পেডুসা দ্বীপের দূরত্ব প্রায় ৩০০ কিলোমিটার। তিউনিসিয়া থেকে ইতালির সিসিলিও প্রায় কাছাকাছি। এছাড়া মরক্কোর উপকূল থেকে স্পেনের উপকূল জিব্রাল্টার প্রণালীর মাধ্যমে বিভক্ত হয়েছে। যা মাত্র ১৪ কিলোমিটার প্রশস্ত। এগুলোর বাইরে এশিয়া ও ইউরোপ মহাদেশের মাঝখানে অবস্থিত তুরস্ক দিয়েও অনেকে ইউরোপে যেতে চাই কারণ তুরষ্ক থেকে গ্রিসের অনেকগুলো দ্বীপ বেশ কাছাকাছি। এই অল্প দূরত্বের জন্যই মানুষ ভাবে নৌকায় চেপে সহজেই ইউরোপে পৌছে যাওয়া সম্ভব। তাদের মনে হয় সাগর পাড়ি দিলেই ইউরোপের মাটি আর এটাই তাদের বড় এক ভুলের সুচনা। আফ্রিকার দেশের অনেক জায়গাতে সীমান্ত নিরাপত্তা বেশ দূর্বল। লিবিয়ার মতো দেশে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, গৃহযুদ্ধ আর নানা সশস্ত্র গোষ্ঠীর দখলদারির কারণে আইন শৃঙ্খলা প্রায় ভেঙে পড়েছে। ফলে সেখানে কোনো সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই বললেই চলে। সে কারণে মরক্কো, তিউনিসিয়া, লিবিয়া এবং তুরষ্কের নির্জন সৈকত অথবা নিরিবিলি সামুদ্রিক ঘাটগুলো পাচারকারীদের কার্যক্র*-র জন্য নিরাপদ ঘাটি হয়ে উঠেছে। এদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হলেও পাচারকারীরা আবারো নতুন নতুন পথ বের করে ফেলে। ইউরোপে ঢোকার জন্য প্রধানত তিনটি অবৈধ রুট সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় রুট, মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় রুট এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় রুট। পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় রুটে মূলত মরক্কো থেকে স্পেনের দিকে যাওয়া হয়। অনেকেই ছোট নৌকা ব্যবহার করে স্পেনের সিউতা বা মেলি শহরে ঢোকার চেষ্টা করে। মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় রুট হলো সবচেয়ে ভয়ংকর। এই রুটে যারা যায় তারা লিবিয়া, তিউনিসিয়া থেকে যাত্রা শুরু করে ইতালির ল্যাম্পডোসা দ্বীপ বা সিসিলিতে গিয়ে পৌছাতে চেষ্টা করে। ২০২৪ সালে এই রুটেই মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ছিলো এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় রুটে তুরষ্ক থেকে গ্রিসের দ্বীপগুলোর দিকে যাত্রা করা হয় এই পথেও ঝুঁকি কম নয়। তবে ভূমধ্যসাগরের মাঝখান দিয়ে যাওয়া রুটের তুলনায় এখানকার দূরত্ব কিছুটা কম।

শুধু সাগর পথেই নয় কখনো আবার স্থলপথেও ইউরোপে ঢোকার চেষ্টা করা হয়। স্থলপথে অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার এই রাস্তা বলকান রুট নামে পরিচিত। স্থলপথেও সীমাহীন ভোগান্তি থাকলে ও সাগরপথের বিপদ আর ভয়াবহতার তুলনায় তা অনেকটা কমই বলা চলে। আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারীদের চক্র গোপনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে আফ্রিকায় জড়ো করে আনে। এর পর বিভিন্ন পুরনো নৌকায় উঠিয়ে তাদেরকে সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। পাচারকারীরা বা দালালরা অভিবাসীদের কাছে মিথ্যা স্বপ্ন বিক্রি করে। তারা বলে মাত্র দুই তিন ঘন্টার নৌকা যাত্রা করলেই ইউরোপ। তারা অভিবাসীদের বোঝায় সাগর খুবই শান্ত। এই সাগরে কোনো ভয়ের কারণ নেই এবং ইতালি বা স্পেন একদম কাছে। এইসব কথা বিশ্বাস করেই মানুষ বিপদে পড়ে। কারন তাদের মন ইউরোপের স্বপ্নে বিভোর থাকে। একটি নৌকায় মাত্র ২০-৩০ জন ওঠার কথা থাকলেও সেখানে ৭০-৮০ জনকেও গাদাগাদি করে ওঠানো হয়। ফলে সামান্য ঢেউ এলেই নৌকা ডুবে যায় বা উল্টে যায়। ২০২৩-২৪ সালে ভূমধ্যসাগরে অন্তত ৩০০০ এর বেশি মানুষ এভাবেই প্রাণ হারিয়েছে অথবা নিখোজ হয়েছে। এইসব নৌকায় থাকে না পর্যাপ্ত খাবার, পানি বা জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব নৌকার কোনো দক্ষ মাঝি বা চালকও থাকে না। তারা অবৈধ অভিবাষীদের মধ্যে থেকে কাউকে নৌকা চালানোর দ্বায়িত্ব দেয়। এমনকি যেসব ভাংগাচুড়া নৌকায় তাদেরকে পাঠানো হয় তাতে কোনো জিপিএস বা দিক নির্ণয়ের যন্ত্র থাকে না। তাই অনেক সময় যাত্রীরা দিক হারিয়ে দিনের পর দিন মাঝ সাগরে ভাসতে থাকে। দালালরা মাত্র দুই-তিন ঘন্টার যাত্রার কথা বললেও কখনও কখনো এই যাত্রা শেষ হতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। যাত্রাপথে নৌকা নষ্ট হয়ে যাওয়া, খাবার পানি শেষ হয়ে যাওয়া এবং মাঝ সমুদ্রেই প্রাণ হারানোর একটি অতি স্বাভাবিক ঘটনা কিন্তু সেই বিপদে দালালরা তাদের পাশে থাকে না তারা টাকা নিয়ে আগেই গা ঢাকা দেয় এবং অভিবাসন প্রত্যাশিদের জন্য রেখে যায় শুধু কান্না আর মৃত্যুর পরোয়ানা। শুধু তাই নয় লিবিয়া বা তুরষ্কের ক্যাম্পগুলোতে অনেক সময় অভিবাসন প্রত্যাশীদের বন্দী করে অত্যাচার করা হয়। তখন তাদের পরিবারের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ মুক্তিপণ দাবি করে পাচারকারীরা। এর ফলে জমিবিক্রি করে বা ঋণ করে ইউরোপে পাড়ি দেওয়ার আশায় থাকা পরিবারগুলো আরো বড় বিপদের সম্মুখীন হয়। ইউরোপ মানেই অনেকের কাছে স্বপ্নের দেশ। বিশেষ করে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্যে বা দক্ষিণ এশিয়ার মানুষেরা ভাবে ইউরোপে গেলেই কাজ পাওয়া সহজ হবে। এবং সেই সাথে ভালো বেতন পাওয়া যাবে। অনেকেই ইউরোপে থাকা আত্মীয় বা বন্ধুদের গল্প শুনে ভাবে ইউরোপে গেলেই টাকা উপার্জন খুব সহজ। কিন্ত বাস্তবতা অনেক কঠিন। ইউরোস্টেট এর হিসাব অনুযায়ী ২০২৪ সালে ইউরোপের গড় মূল্যস্ফীতি প্রায় ৫.৫ শতাংশ। ইউরোপে খাদ্যদ্রব্য, বাসাভাড়া, গ্যাস-বিদ্যুৎ সবকিছুর দাম অনেক বেড়েছে। জার্মানি, ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স সব দেশেই নিত্য প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতেই মানুষের নাভিশ্বাস অবস্থা। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৪ শতাংশের বেশি। স্পেন বা গ্রিসের মতো দেশে বেকারত্বের হার ৩০ শতাংশের কাছাকাছি। বিশ্বব্যাংক এবং ইউরোপিয়ান কমিশনের তথ্য অনুযায়ী ইউরোপে এখন অন্তত নয় কোটির বেশি মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করছে। অনেক শহরে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা রেকর্ড উচ্চতায় পৌছে গেছে। তাছাড়া ইউরোপের বহুদেশের রাজনীতি এখন অনেক বেশি অভিবাসনবিরোধী হয়ে উঠেছে। যেমন ইতালি, হাঙ্গেরি, ফ্রান্সে কড়া অভিবাসন নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। এর ফলে নতুন অভিবাসীদের জন্য চাকরি পাওয়া, থাকার জায়গা পাওয়া আগের চেয়ে অনেক কঠিন হয়ে গেছে। শুধু তাই নয় অবৈধভাবে ইউরোপের উপকূলে পৌঁছালেই স্বপ্ন পূরণ হয় না। অতীতে একসময় ইউরোপের কোনো দেশে পৌঁছাতে পারলেই তাদেরকে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দেওয়া হতো এবং ধীরে ধীরেই তারা নাগরিকত্ব লাভ করতো। কিন্তু বর্তমান সময়ে এইসব অবৈধ অভিবাসীদের ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয়। যেখানে বছরের পর বছর কাগজপত্রের ঝামেলায় ভুগতে হয়। সুতরাং ইউরোপের জীবন সোনার হরিণ ভাবার কনো যৌক্তিক কারণ নেই। কারো কারো ভাগ্যে হয়তো নতুন জীবন থাকলেও হাজার হাজার মানুষ ভূমধ্যসাগরেই চিরতরে হারিয়ে যায়। এবং বাকিদের আরেক দঃসহ জীবনের সূচনা হয়।

ইউরোপের মতোই বিপুল সংখ্যক অভিবাসন প্রত্যাশী অবৈধভাবে আমেরিকা যাওয়ার জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় রুট হলো ডারিয়ান গ্যাপ। পানামা ও কলম্বিয়ার মাঝে অবস্থিত ১০০ কিলোমিটার মতো দীর্ঘ পাহাড়ি বনাঞ্চল ডারিয়ান গ্যাপ পৃথিবীর সবচেয়ে বিপদজনক ও রহস্যময় স্থান গুলোর একটি। ডারিয়ান গ্যাপ কতটা ভয়ংকর জায়গা এবং অবৈধভাবে আমেরিকা যাওয়ার জন্য মানুষ জীবনের রিস্ক নিয়ে সেখান থেকে যায়।

No comments

Powered by Blogger.