Header Ads

সুদের ফাঁদে বাংলাদেশ? কেন, কীভাবে এই ফাঁদে পড়ছে?

সুদের ফাঁদে বাংলাদেশ?  কেন, কীভাবে এই ফাঁদে পড়ছে,

সাধারণত একটি দেশের বাজেটের একটি অংশ খরচ করা হয় উন্নয়নের পেছনে। তাছাড়া সরকারের পরিচালন ব্যয় অর্থাৎ সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন, ভাতা এবং অন্যান্য খরচ যোগাতেও বাজেট থেকে বড় অংশ খরচ করা হয়। তাছাড়া, সরকার বিভিন্ন খাত থেকে যে ঋণ করে তার সুদও দেয়া হয় বাজেট থেকেই। তবে, সেটি সাধারণত খুব অল্প থাকে। গত অন্তত ১০ বছর ধরে দেশে বাজেটের একটি বড় অংশ খরচ হয়ে যাচ্ছে শুধু সুদ দিতে গিয়ে। গেল অর্থবছরে সরকার বিভিন্ন খাতে যেসব ব্যয় করেছে তার ২০ শতাংশেরও বেশি খরচ করেছে শুধুমাত্র সুদের পেছনে। চলতি বছরেও এই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের অর্থনীতি সুদের ফাঁদে আটকে যাচ্ছে। অবস্থা এমন দাড়াচ্ছে যে সুদের টাকা দিতে গিয়ে আবারো ঋণের দিকেই যেন যেতে হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে কেন সুদের ফাঁদে আটকে যাচ্ছে দেশ?  সুদের পেছনে বেশি খরচ করতে গিয়ে সরকারকে কোথায় কোথায় খরচ কমাতে হচ্ছে? বাজেটে সুদের চাপ কমাতে সরকারের কী করণীয় রয়েছে?  গত ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে সরকারের বাজেট বাস্তবায়ন ছিল ৬ লক্ষ ৩৩ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে শুধু সুদ দিতে গিয়ে। অর্থাৎ, সরকারের মোট খরচের ২০ শতাংশই খরচ হয়ে গেছে সুদের পেছনে। এই সময়ে সরকার শুধুই সুদের পেছনে যে টাকা খরচ করেছে আশ্চর্যজনক ভাবে প্রায় সমপরিমাণ টাকাই খরচ করেছে উন্নয়নমূলক কাজে। অর্থাৎ ধীরে ধীরে  আমরা এমন একটি অবস্থার দিকে যাচ্ছি যেখানে উন্নয়নমূলক কাজের চেয়েও সরকারের বেশি খরচ করতে হবে সুদের দিকে। এর মূল কারণ হলো সরকারের ব্যয় বাড়ছে প্রতিবছর। কিন্তু সেই হারে আয় বাড়ছে না। ফলে একটা সময় পর্যন্ত শুধু উন্নয়নমূলক কাজের জন্যই ঋণ করতে হতো দেশকে। কিন্তু সরকারের পরিচালন ব্যয় নির্বাহ করতে পারতো আয় দিয়ে। এখন আর সেটি হচ্ছে না। বরং উন্নয়নমূলক ব্যয়ের জন্য যেমন ঋণ করতে হচ্ছে তেমনি পরিচালন ব্যয় অর্থাৎ বেতন, ভাতা দিতে গিয়েও ঋণ করতে হচ্ছে। এদিকে দেশের ঋণের হার বেড়েছে। ফলে, সরকারের  ঋণের বিপরীতে সুদ বাবত খরচও বেড়েছে। শুধু দেশেই নয় বিদেশেও সুদের হার বেড়েছে। শুধু দেশেই নয় বিদেশেও সুদের হার বেড়েছে। সব চেয়ে ভয়ের বিষয় হলো আগামী বছর বাংলাদেশ এলডিসি (LDC) থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। তখন বিদেশ থেকে যে ঋণ করা হয় তার সুদের হার আরও বাড়বে। সুতরাং,  আগামীতে ঋণের সুদ আরো বাড়ছে তাতে সন্দেহ নেই। প্রশ্ন হলো আইএমএফ তো বলছে আমাদের ঋণ এখন পর্যন্ত বিপদজনক পরিস্থিতিতে পৌঁছায়নি।  তাহলে, সুদ পরিশোধে কেন এত কষ্ট হয়ে যাচ্ছে?  এর কারণ হলো গত প্রায় এক দশকে সরকার ঋণ করে ঘি খেয়েছে। হ্যাঁ, অনেকটা সেরকমই। বড় বড় প্রজেক্টে দুর্নীতি এবং অপ্রয়োজনীয় প্রজেক্ট নেয়ার মাধ্যমে খরচ বাড়িয়েছে, ঋণ বাড়িয়েছে। কিন্তু সেসব অবকাঠামো থেকে আয় সেভাবে হচ্ছে না। এর বড় উদাহরণ হলো কর্ণফুলী টানেল।  এই টানেল নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় সাড়ে দশ হাজার কোটি টাকা। চীনের ঋণ এবং বাংলাদেশ সরকারের তহবিল থেকে এটি নির্মাণ করা হয়। এটি উদ্বোধন করা হয়েছে দুই বছর আগে। অথচ এই টানেল দিয়ে যে গাড়ি চলাচল করে তা দিয়ে টানেলের রক্ষণা বেক্ষণের যে ব্যয় সেটি উঠতেই কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অথচ এই ঋণের সুদের টাকা ঠিকই দিতে হচ্ছে। পাশাপাশি ঋণের মূল টাকাও দিতে হবে। এই টাকা আসবে কোথা থেকে?  বাধ্য হয়ে সরকারকে ঋণ করতে হচ্ছে। তাছাড়া, জিডিপির তুলনায় সরকারের আয় না বাড়লেও কর্মকর্তা, কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ঠিকই বেড়েছে। আমলাদেরকে তুষ্ট রাখতে সব সরকারের মধ্যে এই প্রবণতা দেখা গেছে। এমনকি অন্তর্বতীকালীন সরকারের মধ্যেও এই প্রবণতা দেখা গেছে। ফলে, সরকারের পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। এতে করে ব্যয় নির্বাহ করতে সরকারকে ধীরে ধীরে ঋণের দিকে বেশি করে যেতে হচ্ছে। এদিকে, সরকার সুদের পেছনে বেশি খরচ করতে গিয়ে উন্নয়নমূলক ব্যয় কাটছাট করতে হচ্ছে। অর্থাৎ, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ প্রয়োজনীয় ভাবে বাড়তে পারছে না। অর্থ নীতিবিদরা বলেছেন এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে সরকারকে রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। যারা এরই মধ্যে কর দিচ্ছেন তাদের উপর করের বোঝা আরো বাড়িয়ে নয় বরং যারা ধনী কিন্তু কর দিচ্ছেন না তাদেরকে করের আওতায় আনতে হবে। মানুষকে কর দিতে উদ্ধুদ্ধ করতে হবে সেটি করার জন্য সরকারি সেবা মানুষের জন্য সহজ করতে হবে। সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারীদেরকে বেতন, ভাতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিবেচনা করতে হবে তাদের পারফরম্যান্স এবং সেবা প্রদানে তাদের উদ্যমী মনোভাব। শুধু সরকারি কর্মকর্তা হলেই বেতন বাড়বে এ ধরনের প্রবণতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। একই সাথে সরকারি ব্যয়ে অপচয় দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন আগামিতে সরকারের যেই আসুক তাকে সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় বড় রকমের নজরদারী রাখতে হবে। নইলে পরিস্থিতি এমন হবে যে ঋণের সুদ পরিশোধেই করতে হবে ঋণ। যেটি আমাদেরকে একটি দুষ্ট চক্রে ফেলে দিতে পারে।

No comments

Powered by Blogger.