পায়রা বন্দর ও এক প্রাচীন রাখাইন গ্রাম
২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে তালতলীর রাখাইন জনগণ তাকে এক শ্রদ্ধাঞ্জলিপত্র প্রদান করেছিল। শ্রদ্ধাঞ্জলিপত্রে রাখাইনরা লিখেছিল, 'রাখাইন সম্প্রদায় একটি অনগ্রসর ক্ষয়িষ্ণু জনগোষ্ঠী।' ্তু্থশ্রদ্ধাঞ্জলিপত্রের দুটি শব্দই বেশ গুরুত্ববহ, 'অনগ্রসর' এবং 'ক্ষয়িষ্ণু'। ২০১৭ সালে বাংলাদেশে রাখাইনদের মোট সংখ্যা ছিল প্রায় ১৪ হাজার ৫০০। দেশের উপকূলজুড়ে প্রাচীন রাখাইন সভ্যতার নিদর্শন থাকা সত্ত্বেও রাখাইন জনগণ দেশের মূলধারায় উপেক্ষিত। পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার রাঙ্গাবালী দ্বীপে আদি রাখাইন বসতি স্থাপনের ইতিহাস জানা গেলেও আজ পুরো বরিশাল বিভাগ রাখাইনশূন্য হয়ে পড়েছে। উন্নয়নের নামে উপকূলের রাখাইন ভূমি হারানোর প্রসঙ্গগুলো অনেকটাই অনালোচিত। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার লালুয়া ইউনিয়নের এক আদি রাখাইন গ্রামের নাম ছিল ম্রাইবুনিয়া। ম্রাই মানে সমুদ্র মোহনার নদী এবং বুনিয়া মানে কিনার। ম্রাইবুনিয়া গ্রামটিরও অবস্থান ছিল সমুদ্র মোহনার নদীর কিনারে। জলোচ্ছ্বাস ও বড় বন্যায় গ্রামটি নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯৬৮ সালে গ্রামটি উঠে যায়। ওই সময় গ্রামের মাতবর ছিলেন নাপিঙএ্যা এবং গ্রামে প্রায় ৮০টি রাখাইন পরিবার ছিল। ম্রাইবুনিয়ার রাখাইনদের অনেকেই ধানখালী ইউনিয়নে নতুন আবাস তৈরি করেন। পরে বাঙালি আধিক্যের কারণে গ্রামটি মরিচবুনিয়া নামে পরিচিতি পায়। ২০১৬ সালে তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে এ গ্রামের অনেকেই তাদের জমি হারিয়েছেন।
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় সাবমেরিন কেবলের ল্যান্ডিং স্টেশনের জন্য গোড়াআমখোলার মংচিউ তালুকদারের জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। তবে সংকট প্রবল হয়েছে পায়রা সমুদ্রবন্দর ঘিরে। পটুয়াখালীর কলাপাড়ার টিয়াখালী ইউনিয়নের ছয়ানি রাখাইনপাড়ার কাছে ইটবাড়িয়ায় রাবনাবাদ চ্যানেল-সংলগ্ন আন্ধারমানিক নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের তৃতীয় ও দক্ষিণ এশিয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর। ২০১৩ সালের ১৯ নভেম্বর এর ভিত্তিফলক স্থাপিত হয়, ২০১৬ সালের ১৩ আগস্ট বন্দরটি আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। ৫ নভেম্বর পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন ২০১৩ অনুমোদিত হয়। পায়রা সমুদ্রবন্দর পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার টিয়াখালী ইউনিয়নের ছয়ানিপাড়ার রাখাইনদের কৃষিজমি তাদের প্রতিবাদ সত্ত্বেও অধিগ্রহণ করেছে। এ বিষয়ে বারবার প্রশাসন বরাবর নিজেদের কৃষিজমি সুরক্ষার আবেদন জানিয়েছেন তারা। গত ৫ জুলাই এ নিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও রাখাইনদের নিয়ে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসনের সভা হয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ ভূমির বিরোধ মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত রাখাইনদের মানসম্মত আবাসনের দায়িত্ব নিয়েছে। অধিগ্রহণকৃত ৫.৪০ একর জমির সরকারি মূল্য প্রায় তিন কোটি টাকা। অবশ্যই সমুদ্রবন্দর দরকার, কিন্তু এক প্রাচীন রাখাইন গ্রামের কি কোনো অবদান নেই?
১৭৮৪ সালে পটুয়াখালীর সমুদ্র উপকূলে রাখাইন বসতি স্থাপনের ইতিহাস জানা যায়। ১৭৮৪-১৯০০ সালের দিকে বরিশাল উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৫০ হাজারের বেশি রাখাইন বসবাস করত। ১৯০০-১৯৪৮ সালে এই সংখ্যা হয় ৩৫ হাজার। ১৯৯০ সালে ৪০০০ জন। রাখাইন লেখক মংতাহানের হাতে লেখা এক পাণ্ডুলিপি থেকে জানা যায়, ১৯০০ সালে পটুয়াখালী ও বরগুনা অঞ্চলে ২৪২টি রাখাইনপাড়া ছিল (কলাপাড়ায় ১২০, আমতলীতে ৬৯, গলাচিপায় ২৯ এবং বরগুনায় ২৪টি)। ২০০৪ সালে উল্লিখিত অঞ্চলে ৪৭টি রাখাইনপাড়া অবশিষ্ট ছিল (কলাপাড়ায় ২৮, আমতলীতে ১৩, গলাচিপায় ৫ এবং বরগুনায় ১টি)। ২০১৪ সালে বেসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান কারিতাস-এর বরিশাল অঞ্চলের ইন্টিগ্রেটেড কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (আইসিডিপি-রাখাইন) জরিপ অনুযায়ী ওই উপকূলীয় অঞ্চলের রাখাইন জনসংখ্যা প্রায় ২,৫৬১। ২০১৭ সালে ব্যক্তিগতভাবে পটুয়াখালী ও বরগুনা অঞ্চলের প্রবীণ রাখাইনদের সঙ্গে আলাপ করে মোট ২৩৭টি রাখাইন গ্রামের নাম পাই। বর্তমানে ১৯২টি রাখাইন গ্রামের কোনো হদিস নেই। এখন পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় ২৮টি এবং গলাচিপা উপজেলায় ৪টি রাখাইন গ্রাম আছে। বরগুনা জেলার তালতলী ও সদরে ১৩টি রাখাইন গ্রাম আছে। বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলে রাখাইনদের এই নিদারুণ জনমিতি বিশ্নেষণ করে দেখা যায়, মাত্র দুইশ বছরে প্রায় ৮১ ভাগ রাখাইন গ্রাম বেদখল হয়ে রাখাইনশূন্য হয়েছে।
পটুয়াখালীর কলাপাড়ার টিয়াখালী ইউনিয়নের ছয়ানিপাড়াটি গড়ে ওঠে ১৭৬০ সালের দিকে। ২০১৭ সালে ছয়ানিপাড়ার এই জনইতিহাস বুঝতে সহায়তা করেছিলেন গ্রামের প্রবীণ নারী-পুরুষ সবাই। চিংদামং (দামু), পেশা-কৃষি, মা-ফ্রু মা য়ে ও বাবা-গংশে মাতবর; ফ্রু মা য়ে (৯০), মা-মেলা ফ্রু ও বাবা-লুফ্রু মাতবর; উথিংমং (৬২), মা-সুইন মা ও বাবা-ম্রাথয় মাতবর; সুইন মা (৮৫), মা-উইদ মা ও বাবা-সেমো মাতবর; মামাএ (৫৬), মা-ফ্রুমাএ ও বাবা-গংশে মাতবর; চিলাউ (৯৫), মা-মামাসি ও বাবা-লুফু মাতবর; প্রুমাইয়ে (৮৭), মা-মামাসি ও বাবা-লুফ্রু; গংশে মাতবর (১০০), মা-ফচামা ও বাবা-নি হ্লাএ; প্রুমাইয়ে (৯০), মা- মেলাপ্রু ও বাবা-লুফ্রু মাতবর। গ্রামের সবচেয়ে প্রবীণ মানুষ গংশে মাতবর তখনও বেঁচে ছিলেন। মোধুপ্রিমাই (পায়রা) এবং টিয়াখালী ম্রাই (টিয়াখালী) নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা ছয়ানিপাড়া গ্রামটির উত্তর দিকে ছয়ানিপাড়া খাল, যেখানে একটি স্লুইসগেট আছে। পূর্বে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সড়ক, পশ্চিমে গাজীবাড়ি মধ্যটিয়াখালী গ্রাম এবং দক্ষিণে কৃষিজমি ও মোধুপ্রিমাই নদী। রাখাইন ভাষায় মো মানে খুব বৃষ্টিপ্রবণ, ম্রাই মানে নদী। মোধুপ্রিমাই মানে বৃষ্টিপ্রবণ এলাকার নদী। ফ্রু ওয়ে মা ও পৌম মাতবর এই ছয়ানিপাড়ার পত্তন করেন। তাদের সন্তান লুফ্রু মাতবর। লুফ্রু মাতবর ও মামাসি/ মেলাফ্রুর ৪ ছেলে ও ২ মেয়ে। লুফ্রু ও মামাসির দুই মেয়ে প্রুমাইয়ে এবং চিলাউয়ে। দুই বোনের ভেতর চিলাউয়ে অবিবাহিত এবং তিনি পারিবারিক আট কানি জমি পেয়েছিলেন, যা বাঙালিরা জোরপূর্বক দখল করেছে। প্রুমাইয়ের সঙ্গে বিয়ে হয় পটুয়াখালীর কলাপাড়ার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের মরিচবুনিয়ার গংশে মাতবরের এবং বিয়ের পর তারা ছয়ানিপাড়াতেই বসবাস করছেন। প্রুমাইয়ে ও গংশে মাতবরের ৫ ছেলে ৩ মেয়ে। পরিবার থেকে গংশে মাতবরের ছেলে সাত একর কৃষিজমি পান। পৌও মাতবর যখন ছয়ানিপাড়ার প্রধান ছিলেন তখন এখানে ৬৫ পরিবার রাখাইন ছিলেন। ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরে এই গ্রাম পুরোটাই তলিয়ে যায় এবং রাখাইনরা আবার সবকিছু গড়ে তোলে।
রাষ্ট্রীয়ভাবে ছয়ানিপাড়ার রাখাইন ভূমি অধিগ্রহণ শুরু হয় নানাভাবেই। ২০১৪ সালে রাখাইনদের ১০ কড়া (৩৩ শতক) জায়গা নিয়ে স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তর গ্রামের উত্তরে ছয়ানিপাড়া খালে একটি স্লুইসগেট তৈরি করে। খালের ধারে একটি প্রত্নতাত্ত্বিক পবিত্রস্থল, রাখাইন ভাষায় বলে 'চোয়ঁসাবা'। তিন শতক এই পবিত্রস্থলে চারটি প্রাচীন চোয়াঁবা (করঞ্জা) ও ১০টি জাবলংবা (খেজুরগাছ) গাছ আছে। গ্রামের মানুষ এই পূজাস্থলে মানত ও দৈনন্দিন নানা পূজাকৃত্য পালন করে। এ ছাড়া বছরে চৈত্রসংক্রান্তিতে সাংগ্রেংপোওয়ে, আশ্বিন পূর্ণিমায় ওয়াজআ এবং শ্রাবণ পূর্ণিমাতে ওয়াসো উৎসব আয়োজিত হয়। পায়রা সমুদ্রবন্দরের জন্য ছয়ানিপাড়ার অধিগ্রহণকৃত জমির ভেতর আম্রালে বা মাঝারি উঁচু জমি এবং আন্নিলে বা নিচু জমি আছে। সব জমিনই কয়েক ফসলি জমি। এখানে আমন ও বোরো মৌসুমে ধান হয়, রবিশস্য ফলে এবং মহিষ চরে। গ্রামে একটি প্রাচীন কিয়াংঘর বা মন্দির ছিল, জমি অধিগ্রহণ শুরু হলে ২০১৫ সালে মন্দিরটি গ্রামের ভেতরে পুকুর পাড়ে এনে অস্থায়ীভাবে রাখা হয়। এতে চারদিকে গ্রামটি ছোট হয়ে আসে। কেবল আয়তনে ছোট নয়, ছয়ানিপাড়ার চারদিকে উন্নয়নের যে বাহাদুরি চলছে তার ভেতর আত্মপরিচয় ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে কোনো রাখাইন গ্রামের টিকে থাকা বিপজ্জনক। ছয়ানিপাড়ার বেড়িবাঁধ-সংলগ্ন রাখাইনদের জমি দখল করে পার্শ্ববর্তী গ্রামের প্রভাবশালী বাঙালিরা ঘর নির্মাণ করছে। একদিকে বৃহৎ পায়রা বন্দর এবং অন্যদিকে এক ক্ষয়িষ্ণু প্রাচীন রাখাইন গ্রাম। এটি বন্দর বনাম আদিবাসী গ্রামের কোনো তর্ক নয়। এটি রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন দর্শনের মৌলিক প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত। নানান জায়গার সব ধর্মের মানুষ এখানকার মেলা ও উৎসবে অংশ নিত। পায়রা বন্দর নির্মাণের পর থেকেই এই আয়োজন এবং এই ঐতিহাসিক সামাজিক সংহতি থেমে গেছে। রাখাইন পঞ্জিকামতে ছয়ানিপাড়াতে বৈশাখের চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ দিন পর্যন্ত বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের পানি খেলা হতো দারুণ জাঁকজমকভাবে। শেষ ১৩৭৯ মগীসনে কেবল নিয়ম রক্ষার্থে পানিখেলা হয়েছে। এক বৃহৎ সমুদ্রবন্দরের তলায় চাপা পড়ে থাকবে একটি প্রাচীন গ্রামের এমনতর কত স্মৃতি-বিস্মৃতি। মানুষে মানুষে গ্রামীণ সখ্য, সৌহার্দ আর সংহতির টগবগে সব আখ্যান। এক অধিপতি উন্নয়নের কাছে কিছু মানুষ তাদের জমি, জীবিকা, নিদর্শন, ধর্মস্থল, ঐতিহ্য হারাবে। অন্যদিকে বাঙালি বর্ষবরণের শোভাযাত্রা বিশ্বঐতিহ্য হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হতে থাকবে। আর এই নিদারুণ বৈষম্যের গল্প নিয়েই বড় হবে এক আজব 'মানবিক প্রজন্ম'। বিশাল সমুদ্রবন্দরের কাছে এক ক্ষয়িষ্ণু ছয়ানিপাড়া হয়তো হারিয়েই যাবে। কিন্তু রাষ্ট্র কি মনে রাখবে 'একদা এখানে তিনশ বছরের প্রাচীন এক রাখাইন গ্রাম টিকে থাকার জন্য ন্যায়বিচার চেয়েছিল?'


No comments